দুই মন্দির নিয়ে বিতর্ক, পশ্চিমবঙ্গে নিচু জাতের পুজো নিয়ে তুমুল ঝড়

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান ও নদিয়া জেলায় মন্দিরে প্রবেশাধিকার নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিম্নবর্ণের মানুষদের মন্দিরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসন এবং আদালতের হস্তক্ষেপ ঘটেছে। এই ঘটনাগুলি সামাজিক বৈষম্য এবং অস্পৃশ্যতার মতো প্রাচীন সমস্যাগুলিকে আবারও সামনে এনেছে।

পূর্ব বর্ধমানের গীধগ্রামে ঘটনা

পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া ১ নম্বর ব্লকের গীধগ্রামে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো একটি শিবমন্দির রয়েছে। এই মন্দিরে নিম্নবর্ণের মানুষদের প্রবেশাধিকার ছিল না। গ্রামের ১৩০টি পরিবার, বিশেষত দাস সম্প্রদায়ের সদস্যরা, বছরের পর বছর মন্দিরে প্রবেশ করতে পারেননি। গাজন, শিবরাত্রির মতো বড় উৎসবেও তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হত।

ফেব্রুয়ারির শেষে শিবরাত্রির দিনে নিম্নবর্ণের পরিবারগুলি একজোট হয়ে মন্দিরে পুজো দিতে যায়। কিন্তু মন্দির কমিটি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। এই ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পুলিশ পিকেট বসানো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে এবং একটি বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে মন্দির সকলের জন্য উন্মুক্ত হবে। এরপর নিম্নবর্ণের পাঁচজন প্রতিনিধি মন্দিরে প্রবেশ করে শিবের পুজো করেন।

নদিয়ার কালীগঞ্জে বিতর্ক

একই ধরনের ঘটনা সামনে এসেছে নদিয়ার কালীগঞ্জে। বৈরামপুরের একটি প্রাচীন শিবমন্দিরে দাস সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা যতন দাস বলেন, “আমাদের পরিবারের সদস্যদের মন্দিরে পুজো দেওয়ার অনুমতি নেই। আমরা সন্ন্যাসী হতে পারি না। এই অভিযোগ নিয়ে আমরা জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।”

এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন। আদালত এই বিষয়ে কড়া ভাষায় প্রশ্ন তোলে। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ বলেন, “কী করে এটা হয়? পুলিশের ভূমিকা কী? একজন মানুষ তাঁর অধিকার পাবেন না! এটা তো বাংলায় ছিল না। এমন সমস্যা এখনো বাংলায় নেই বলেই বিশ্বাস করি।” আদালত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিশদ রিপোর্ট চেয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

কলকাতা হাইকোর্ট এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশাসন এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ বলেন, “পুলিশ কী করছে? এটা পুলিশের অক্ষমতা। ওসি নন, কোনও সিনিয়র অফিসারকে দায়িত্ব নিতে হবে। পিছনে যদি অন্য কোনও কারণ থাকে, সেটাও খুঁজে দেখা পুলিশের কাজ।” আদালত এই বিষয়ে বিশদ রিপোর্ট চেয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সংবিধান ও সামাজিক বৈষম্য

ভারতীয় সংবিধানের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, অস্পৃশ্যতা একটি নিষিদ্ধ বিষয়। ১৯৫৬ সালে অস্পৃশ্যতা বিরোধী আইন তৈরি হলেও সমাজে এখনও এই সমস্যা বিদ্যমান। গীধগ্রাম এবং কালীগঞ্জের ঘটনাগুলি সামাজিক বৈষম্যের এই দিকটি আবারও সামনে এনেছে।

মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী রঞ্জিত শূর বলেন, “আমাদের সমাজে বিক্ষিপ্তভাবে ভেদাভেদের ঘটনা ঘটে। সবসময়ে তা প্রকাশ্যে আসে না। পূর্ব বর্ধমান ও নদিয়ায় বিষয়টা প্রকাশ্যে এসেছে। এখানে যা হয়েছে, সেটা উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণের এক ধরনের বিদ্রোহ। তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষণের শিকার।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই ঘটনাগুলি সামাজিক বৈষম্য এবং অস্পৃশ্যতার মতো প্রাচীন সমস্যাগুলিকে আবারও সামনে এনেছে। প্রশাসন এবং আদালতের হস্তক্ষেপে মন্দিরে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিতর্কের সমাধান হলেও, সামাজিক মনোভাব পরিবর্তনের জন্য আরও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে দলিত আন্দোলন এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের সংহতির ইতিহাস রয়েছে। তবে এই ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে সামাজিক বৈষম্য এখনও সম্পূর্ণভাবে দূর হয়নি। প্রশাসন, আদালত এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে।