বিশেষ: মহাবিশ্বের সব ছায়াপথ কী একই দিকে ঘোরে? জেনেনিন কি বলছে বিজ্ঞানীরা?

নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (জেডব্লিউএসটি) উৎক্ষেপণের মাত্র তিন বছরের মধ্যে মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য উন্মোচন করেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে যে, গভীর মহাবিশ্বের বেশিরভাগ ছায়াপথ একই দিকে ঘুরছে, যা বিজ্ঞানীদের ধারণায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
‘ক্যানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি’র গবেষক লিওর শামির ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ অ্যাডভান্সড ডিপ এক্সট্রাগ্যালাকটিক সার্ভে’ (জেএডিইএস) থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে এই আবিষ্কার করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যবেক্ষিত ২৬৩টি ছায়াপথের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ একদিকে ঘুরছে, আর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিপরীত দিকে ঘুরছে। এটি অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত, কারণ এলোমেলো মহাবিশ্বে এই সংখ্যা তাত্ত্বিকভাবে প্রায় সমান হওয়ার কথা।
শামির বলেন, “এই পার্থক্য এতটাই স্পষ্ট যে, ছবিগুলো দেখলেই যে কেউ তা বুঝতে পারবেন। এর জন্য বিশেষ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রয়োজন নেই।” বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আবিষ্কার মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ায় বড় প্রশ্ন তুলেছে।
সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
গবেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার পেছনে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে যে, মহাবিশ্ব নিজেই ঘূর্ণায়মান অবস্থায় ‘জন্ম’ নিয়েছিল। এই ধারণা ‘ব্ল্যাক হোল কসমোলজি’ তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়, পুরো মহাবিশ্ব একটি ব্ল্যাক হোলের ভেতরে অবস্থান করতে পারে। এটি সত্যি হলে মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা অসম্পূর্ণ বলে প্রমাণিত হবে।
অন্য একটি ব্যাখ্যা হতে পারে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। পৃথিবী ও সৌরজগৎ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরছে, এবং এই গতিবিধি ‘ডপলার শিফট’ নামক ঘটনার মাধ্যমে দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলোর ওপর প্রভাব ফেলে। যে ছায়াপথগুলো পৃথিবীর গতির বিপরীতে ঘুরছে, তাদের আলো উজ্জ্বল দেখায়, ফলে এগুলো শনাক্ত করা সহজ হয়। এ কারণে হয়তো ছবিতে একদিকে ঘূর্ণায়মান ছায়াপথ বেশি ধরা পড়েছে।
মহাবিশ্বের রহস্যে নতুন মোড়
যদি দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি সঠিক হয়, তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের দূরত্ব পরিমাপের পদ্ধতি নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান পরিমাপ পদ্ধতিতে ভিন্নতা থাকলে তা মহাজাগতিক রহস্য যেমন—মহাবিশ্বের বিভিন্ন হারে সম্প্রসারণ বা কিছু ছায়াপথের মহাবিশ্বের চেয়ে পুরোনো মনে হওয়ার কারণ—ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণাটি ‘মান্থলি নোটিসেস অফ দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জানার এখনও অনেক কিছু বাকি। মহাবিশ্ব কি সত্যিই ঘূর্ণায়মান অবস্থায় জন্ম নিয়েছে, নাকি আমাদের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অজানা। জেডব্লিউএসটি’র এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাকাশের রহস্য উন্মোচনের পথে আমরা এখনও অনেক দূরে রয়েছি।