“বীজ বিভ্রাটে বিকৃত আলুর ফলন”- মাথায় হাত কৃষকের, ক্ষতির মুখে শত শত কৃষক

আরামবাগে জমি থেকে আলু তুলে চাষি থেকে শ্রমিক—সকলের চক্ষু চড়কগাছ! আলুর আকৃতি দেখে সবাই অবাক। কোনও আলু মানুষের মতো নাক-মুখ-চোখ নিয়ে, কোনও আলু হাঁস, মুরগি, ঘোড়া, বিড়াল বা গন্ডারের মতো, আবার কোনও কোনও আলু ফুলদানি বা পুতুলের আকৃতির! প্রথমে চাষিরা ভেবেছিলেন, দু’-একটা আলু হয়তো এমন হতে পারে। কিন্তু জমি খুঁড়ে দেখা গেল, বেশিরভাগ আলুই এই বিকৃত আকৃতির। এই ঘটনায় আরামবাগ ব্লকের মলয়পুর এক ও দুই নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের বালিয়া ও চকবেশে এলাকায় তীব্র শোরগোল পড়ে গেছে।
চাষিদের ক্ষতি ও অভিযোগ
চাষিরা জানিয়েছেন, প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বিঘা জমির আলু এই অবস্থায় রয়েছে। এই আলু বাজারে কেউ কিনতে চাইছে না। অথচ বিঘে প্রতি ৪০ হাজার টাকা খরচ করে তারা আলু চাষ করেছিলেন। বীজের সমস্যার কারণে এখন সব আলু মাঠে পড়ে রয়েছে। যিনি বীজ সরবরাহ করেছিলেন, তাঁকে বারবার জানানোর পরও কোনও সুরাহা হয়নি। ফলে আরামবাগের শত শত চাষি এখন বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে। তাঁরা বলছেন, লাভ তো দূরের কথা, চাষের খরচও উঠবে না।
মলয়পুর-১ পঞ্চায়েত এলাকার চাষিদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, স্থানীয় এক আলুবীজ ব্যবসায়ী তাঁদের নকল বা নিম্নমানের বীজ দিয়েছেন। এর ফলে আলু খাওয়ার উপযোগী হয়নি। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ধসা রোগের কারণে ফলন অনেক কমেছে বলে তাঁরা মনে করছেন। চাষি অসিত সরকার বলেন, “প্রায় ১৫-১৬ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। কিন্তু বেশিরভাগ আলু বিকৃত আকৃতির। বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। আদিত্য দত্ত নামে এক বীজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এই বীজ কিনেছিলাম। বীজের গোলমালের জন্যই এই অবস্থা।”
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
আরামবাগ পঞ্চায়েত সমিতির কৃষি কর্মাধ্যক্ষ শ্যামল মিশ্র বলেন, “এই ঘটনার কথা শুনেছি। তবে এখনও কোনও চাষি দপ্তরে অভিযোগ জানাননি। আমরা কৃষি দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।” এদিকে, চাষিদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা দাবি করছেন, বীজ সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের গবেষক পৌলোমী গঙ্গোপাধ্যায় ও গোপাল চৌধুরী জানিয়েছেন, আলুর বিকৃতির জন্য তিনটি প্রধান কারণ দায়ী। প্রথমত, বীজে ভাইরাস সংক্রমণ (পটেটো ভাইরাস-এক্স এবং পটেটো ভাইরাস-ওয়াই)। দ্বিতীয়ত, পুষ্টির অভাব, যার জন্য সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ না হওয়া। তৃতীয়ত, মাটির অসম গঠন, যার ফলে বায়ু চলাচল ব্যাহত হয় এবং আলুর অসম বৃদ্ধি ঘটে। তাঁরা আরও বলেন, “শুধু আলু নয়, পেঁপের পাতা বা ফলেও ভাইরাসের কারণে বিকৃতি দেখা যায়।”
সমাধানের উপায়
পৌলোমী গঙ্গোপাধ্যায় জানান, “এই সমস্যা এড়াতে কৃষি সংস্থা বা বিশ্বস্ত উৎস থেকে উন্নতমানের বীজ নিতে হবে। বীজ শোধন করে মাটিতে পোঁতার পরামর্শ দেওয়া হয়।” তবে এখন যে ক্ষতি হয়েছে, তার প্রতিকারের জন্য চাষিরা এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি
আরামবাগে আলু তোলার কাজ জোরকদমে চললেও, বিকৃত আকৃতির আলু দেখে চাষিরা হতাশ। এই ঘটনায় কৃষক মহলে শোরগোল পড়ে গেছে। বীজ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জোরালো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি দপ্তর কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে সবার নজর।