সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা, হাইকোর্টের ভর্ৎসনার মুখে রাজ্য সরকার

কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উপর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোর শোচনীয় অবস্থা নিয়ে। মথুরাপুরের পুরন্দরপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে দায়ের এক মামলার শুনানিতে তিনি একের পর এক কঠোর মন্তব্য করেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, “আপনারা পার্ক স্ট্রিটের আলোকসজ্জা নিয়ে গর্ব করেন, কিন্তু কলকাতার বাইরে গিয়ে দেখুন কী অবস্থা। মানুষ মারা যাচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আপনারা ভোট নিয়ে চিন্তিত, ভোটারদের নিয়ে নয়।”
মামলাকারীদের অভিযোগ, পুরন্দরপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এদিকে হাসপাতালের জমিতে রাজ্য সরকারের জল প্রকল্পের কাজ চলছে, কিন্তু হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নে সরকারের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। গত প্রায় ৫০ বছরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের শয্যা সংখ্যা একটিও বাড়েনি। বিষয়টি নিয়ে আদালত রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগমের কাছে রিপোর্ট তলব করে। স্বাস্থ্যসচিব জবাবে জানান, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য ১০টি শয্যাই যথেষ্ট। এই রিপোর্ট দেখে প্রধান বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এমন যুক্তি শুধুমাত্র নির্বোধরাই বিশ্বাস করতে পারে।”
প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের উপর একের পর এক কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক ইচ্ছা ছাড়া সরকারি আমলারা কোনো কাজই করতে পারেন না। সরকার ভোট নিয়ে চিন্তিত, ভোটারদের নিয়ে নয়। কিন্তু তারা ভোটারদের ভোটেই ক্ষমতায় এসেছে। তাই ভোটারদের কিছু ফিরিয়ে দেওয়া তাদের কর্তব্য। একটা হুইলচেয়ার দিতেও কি আদালতকে নির্দেশ দিতে হবে?”
তিনি আরও বলেন, “আপনারা পার্ক স্ট্রিটের আলোকসজ্জা নিয়ে গর্ব করেন। কিন্তু কলকাতার বাইরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কী অবস্থা, তা কি জানেন? মানুষ মারা যাচ্ছে। সরকারি পরিকাঠামো না থাকলে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে যাবেই। বাংলার মানুষকে কেন করমণ্ডল এক্সপ্রেসে (বাইরের রাজ্যে চিকিৎসার জন্য) যেতে হয়?”
এই মামলার শুনানি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ দুর্নীতির অভিযোগে জেলবন্দি রয়েছেন। এরই মধ্যে সংক্রমিত স্যালাইনে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্য জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আদালতের এই কঠোর মন্তব্য নিঃসন্দেহে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
এই ঘটনা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে। আদালতের এই সমালোচনা রাজ্য সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে জরুরি সংস্কারের দিকে নজর দিতে বাধ্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।