ডিগ্রি পেতে কানাডা পাড়ি, তারপর ‘উধাও’ ২০ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থী, জেনেনিন রহস্য?

বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তালিকায় ভারতীয় শিক্ষার্থীরা শীর্ষে, এবং তাদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য কানাডা।

ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
কানাডার সরকারি সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়দের হার সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ২৭ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থী কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন, যা মোট আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ৪০ শতাংশ।

তবে সম্প্রতি অভিবাসন সংক্রান্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা অ্যাপ্লাইবোর্ড-এর এক প্রতিবেদন কানাডার শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৫৫,৫০০ ভারতীয় শিক্ষার্থীকে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ১৯,৫৮২ জন শিক্ষার্থী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হননি, এবং এই মুহূর্তে তারা কোথায় আছেন বা কী করছেন— সে বিষয়ে কানাডার সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই।

প্রতারণা নাকি পরিকল্পিত অভিবাসন?
কানাডার সংবাদমাধ্যম টিএনএন-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই ২০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে একাংশ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তারা যেসব কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য কানাডায় এসেছিলেন, বাস্তবে দেখা গেছে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র কাগজে-কলমে অস্তিত্বশীল, কিন্তু কার্যত কোনো শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা কার্যক্রম নেই।

তবে, প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রতারিত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আসলে কানাডায় স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যেই এসেছেন। তারা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হননি এবং বিভিন্ন শহরে ছোটখাটো শ্রমসাধ্য কাজ বা অড জবস করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
অন্টারিওর ব্রাম্পটন শহরের এক শিক্ষার্থী টিএনএন-কে জানান, তিনি সেখানে একটি ‘বিখ্যাত’ কলেজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে এসেছিলেন। কিন্তু কানাডায় পৌঁছে তিনি জানতে পারেন, সেই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ভুয়া— এমনকি কোনো শ্রেণিকক্ষও নেই।

তিনি বলেন,

“আমাকে প্রথমে বলা হয়েছিল, ক্লাস শিগগিরই শুরু হবে। কিন্তু মাস পার হয়ে গেল, ক্লাস আর শুরু হলো না। একসময় বুঝতে পারলাম, আমি প্রতারণার শিকার হয়েছি। ভর্তির জন্য ১২ লাখ রুপি ফি চাওয়া হয়েছিল, ভারতে থাকতেই ৪ লাখ রুপি পরিশোধ করেছিলাম। বাকিটা কানাডায় এসে পরিশোধ করার কথা ছিল,”— টিএনএন-কে জানান ওই শিক্ষার্থী।

তিনি বর্তমানে ব্রাম্পটনের একটি গ্যাস স্টেশনে কাজ করছেন এবং দেশে ফেরার কোনো পরিকল্পনা নেই।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন গুজরাট থেকে আসা ২৭ বছর বয়সী আরেক ‘শিক্ষার্থী’। তিনি বলেন,

“আমার এলাকার অনেকেই এভাবেই কানাডায় স্থায়ী হয়েছে, আমি শুধু তাদের পথ অনুসরণ করেছি। জানি এটি অবৈধ, কিন্তু একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আমার অভিভাবকরা ঋণ নিয়ে আমাকে বিদেশ পাঠিয়েছেন, সেই অর্থ ফেরত দিতেই হবে।”

বর্তমানে তিনি দিনে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে কাজ করেন এবং রাতে ফুড ডেলিভারি বয়ের চাকরি করেন, যাতে দ্রুত অর্থ উপার্জন করে পরিবারকে সহায়তা করতে পারেন।

কানাডা সরকারের কঠোর পদক্ষেপ
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ব সংস্থা (IRCC) নতুন তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছে—

1️⃣ নিয়মিত যাচাই: যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি করায়, তাদের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি ভুয়া বা অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হচ্ছে।

2️⃣ নজরদারি বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীরা বৈধ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কানাডায় অবস্থান করছেন কিনা, তা নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।

3️⃣ আইনি ব্যবস্থা: যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী ভর্তিতে অনিয়ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স এক বছরের জন্য বাতিল করা হবে।

কানাডায় উচ্চশিক্ষার নামে প্রতারণা ও অভিবাসনের প্রবণতা উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বিশেষত, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে ভুয়া কলেজের ফাঁদ, অন্যদিকে পরিকল্পিত অবৈধ অভিবাসন— এই দুই কারণেই কানাডার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিলেও, শিক্ষার্থীদেরও সাবধান হওয়া জরুরি। কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের যথাযথ যাচাই করা, ‘প্রিপেইড সিস্টেম’ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রতারণার ফাঁদ এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া