জলা বুজিয়ে বাড়ি তুলেছি! নির্বিকার ভাবে জানালেন হেলে পড়া বাড়ির মহিলারা

ট্যাংরার ক্রিস্টোফার রোডের হেলে পড়া বাড়ি নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই বিধাননগর পুরনিগমের জগৎপুর এলাকার নেতাজি পল্লীতে দুটি বাড়ি হেলে পড়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। বৃহস্পতিবার সকালে এই খবরটি জানাজানি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, প্রায় এক বছর ধরে বাড়ি দুটি হেলে রয়েছে। প্রশাসনও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না যে বাড়ি দুটির বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ কী।

‘ভয়ের কিছু নেই’ আশ্বাস:

২০২৪ সালের জুন মাসে প্রথম জগৎপুরের নেতাজি পল্লীর একটি তিনতলা বাড়ির একপাশে ঝুঁকে পড়া বাসিন্দাদের নজরে আসে। ওই বাড়ির মালিক মিঠুন করের দাবি, বাড়ি হেলে পড়ার বিষয়টি তৎক্ষণাৎ এলাকার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই ইঞ্জিনিয়ার নাকি তাদের “ভয়ের কিছু নেই” বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। একই কথা প্রতিবেশীদেরও জানানো হয়েছিল। এর মাসখানেক পর পাশের চারতলা বাড়িটিও পাশের বাড়ির দিকে হেলে পড়তে শুরু করে। সেই বাড়ির মালিক শম্পা ঘোষের দাবি, স্থানীয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তাদেরও “বাড়িটা পড়ে যাবে না” বলে ভরসা দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বাঘাযতীনে হেলে পড়া আবাসন সোজা করতে গিয়ে তা ভেঙে পড়ার একটি ভিডিও নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে জগৎপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে।

পুরনিগমের পদক্ষেপ:

স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ঝুঙ্কু মণ্ডল বিধাননগর পুরনিগমের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, দুটি বাড়িই বিপজ্জনকভাবে হেলে রয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়লে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

জলাভূমি থেকে বসতি:

ভিআইপি রোড থেকে ২০ মিনিটের হাঁটা পথেই জগৎপুর। স্থানীয়দের দাবি, এই জগৎপুরের নেতাজি পল্লীতে প্রায় দশ বছর আগে বেশ কিছু জলাভূমি ছিল। পরবর্তীকালে রাতের অন্ধকারে সেই জলাভূমি ভরাট করে একের পর এক বহুতল গড়ে উঠেছে। মিঠুনের বাড়িটি ২০২২ সালে তৈরি হয়। শম্পা ২০১৭ সালে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। অভিযোগ, হেলে পড়া বাড়ি দুটিও জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। মিঠুন ও শম্পা দুজনেই এই অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে নতুন করে বাড়ি তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয় না এবং মিউটেশনও অনেক দিন ধরে বন্ধ। তাই সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তারা এমন জমিতে বাড়ি তৈরি করেছেন। তবে তাদের দাবি, বাড়ি তৈরির সময় নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মানের সাথে কোনো আপস করা হয়নি। দুজনেরই অভিযোগ, বাড়ি তৈরির সময় কেউ তাদের বাধা দেয়নি, এখন হঠাৎ করে সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে।

প্রতিবেশীদের আতঙ্ক:

কাউন্সিলরের অভিযোগের পর বিধাননগরের পুর ইঞ্জিনিয়াররা দুটি বাড়ি পরিদর্শন করেছেন এবং বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছেন। মিঠুন ও শম্পাদের প্রতিবেশী বৈশাখী দত্ত বলেন, “যেভাবে বাড়ি দুটি হেলে রয়েছে, তাতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তারা (মিঠুন ও শম্পা) অনেক কষ্টে বাড়ি তৈরি করেছে। তাই আমরা চাই না বাড়ি দুটি ভেঙে ফেলা হোক। যদি মেরামত করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, সেটাই ভালো।”

কাউন্সিলরদের বক্তব্য ও মেয়রের প্রতিক্রিয়া:

মিঠুনের বাড়িতে শুধু তার পরিবার থাকে, কিন্তু শম্পার বাড়িতে তার পরিবার ছাড়াও আরও দুটি ভাড়াটিয়া পরিবার রয়েছে। শম্পা ও মিঠুন পুরনিগমের কাছে বাড়ি মেরামতের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর বক্তব্য, “দুটি বহুতলই বাম আমলে তৈরি করা হয়েছিল। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এই ঘটনা কলকাতার পাশাপাশি বিধাননগরেও বেআইনি নির্মাণ এবং দুর্বল নির্মাণ কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।