শুধুই কি আরএল? নাকি সমস্যা রয়েছে অন্য ওষুধেও, চলছে কড়া নজরদারি

সম্প্রতি মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে এক প্রসূতির মৃত্যু এবং আরও চারজনের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় রিঙ্গার্স ল্যাকটেট (আরএল) স্যালাইনের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে, চিকিৎসকদের মধ্যে এখন একটি নতুন সন্দেহ দানা বাঁধছে: শুধু আরএল নয়, সিজার বা প্রসবের সময় ব্যবহৃত অন্যান্য ইন্ট্রাভেনাস (আইভি) ওষুধও কি এই বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরএল সাধারণত অন্যান্য সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগেও ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সেখানে এমন সমস্যা দেখা যায় না। তাহলে কেন শুধু প্রসূতি বিভাগেই বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্বাস্থ্য দপ্তর গঠিত ১৩ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি তদন্ত শুরু করেছে।
তদন্তে আরএলের পাশাপাশি অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্র্যাসিন, মিথাইল আর্গোনোভিন এবং মেটোক্লোপ্রামাইড-এর মতো ওষুধগুলির গুণমানও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রসববেদনা বাড়াতে এবং প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ কমাতে প্রায় সকল প্রসূতিকেই অক্সিটোসিন আইভি দেওয়া হয়। কখনও এটি সরাসরি ইঞ্জেকশন হিসেবে, আবার কখনও আরএল ফ্লুইডের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। একই কারণে ভ্যাসোপ্র্যাসিন এবং জরায়ু সংকোচনের জন্য মিথাইল আর্গোনোভিন ব্যবহার করা হয়। সিজারের ক্ষেত্রে বমি ও পাকস্থলির অ্যাসিড ঠেকাতে মেটোক্লোপ্রামাইড ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন সদস্যের মতে, এই ওষুধগুলি, বিশেষ করে অক্সিটোসিন, আরএলের সাথে শুধুমাত্র প্রসূতি বিভাগেই ব্যবহার করা হয়। তাই এই ওষুধগুলির সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার ফলেই কি এই দুর্ঘটনা ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই কারণে, এই ওষুধগুলির নমুনাও পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
ফেডারেশন অফ অবস্টেট্রিক অ্যান্ড গায়নেকলজিক্যাল সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া (ফগসি)-র রাজ্য শাখার সভাপতি বাসব মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, আরএলের সাথে অন্যান্য ওষুধ, বিশেষ করে অক্সিটোসিনের মিলিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু আরএল দূষিত থাকলে একরকম, কিন্তু তার সাথে যদি দূষিত অক্সিটোসিন মেশে, তাহলে ক্ষতি কয়েকগুণ বেড়ে যেতে বাধ্য।
প্রবীণ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের মতে, সরকার সবসময় ডাক্তারদের দোষ খোঁজার চেষ্টা করে। যদি সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হতো, তাহলে আসল সমস্যা ধরা পড়ত। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে ওষুধের গুণমান কখনোই সঠিকভাবে যাচাই করা হয় না।
স্বাস্থ্য দপ্তরের অনেক আধিকারিক মনে করেন, রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল ল্যাবের পরিকাঠামো এতটাই দুর্বল যে সেখানে ওষুধের মান পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। ল্যাবে ৪০ জন টেকনোলজিস্টের জায়গায় মাত্র ১২ জন কাজ করেন। ফলে, মাসে ৩০০টি নমুনা পরীক্ষা করার কথা থাকলেও, সেখানে ৮০-৯০ টির বেশি পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। এর ফলে নমুনার রিপোর্ট আসতে অনেক দেরি হয় এবং ততদিনে সেই ওষুধ হয়তো রোগীদের উপর ব্যবহারও হয়ে যায়। মেদিনীপুরের ঘটনাতেও এমন কিছু ঘটেছে কিনা, তা এখনও জানা যায়নি।