সিনিয়র ডাক্তারের ঘাটতি পৌঁছে গেছে চড়মে, PGT-দের গাইডের লোক কোথায়?

সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিতে সিনিয়র ডাক্তারের অভাব চরমে। নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র সিনিয়র ডাক্তারের তত্ত্বাবধানেই পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি (পিজিটি)-দের সার্জারি বা অ্যানাস্থেশিয়ার কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম প্রায়শই লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেদিনীপুর মেডিক্যালে প্রসূতির মৃত্যু ও অসুস্থতার ঘটনার তদন্তে জানা যায়, ঘটনার রাতে সিনিয়র ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে পিজিটি-রা সিজার করেছিলেন। এর পরেই স্বাস্থ্য দপ্তর পুরোনো নিয়ম মনে করিয়ে দিয়ে আদেশ জারি করে যে, সিনিয়র ডাক্তারের উপস্থিতি ছাড়া পিজিটি-রা ওটিতে ঢুকতে পারবেন না। কিন্তু এই আদেশের পরেও পরিস্থিতির বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানা গেছে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য:
সরকারি চিকিৎসক ও জুনিয়র ডাক্তারদের মতে, নিয়োগের অভাবে সিনিয়র ডাক্তারের এত ঘাটতি যে, প্রায়শই ইমার্জেন্সি সামলাতে এই নিয়ম ভাঙতে হয়। অনেক সময় সিনিয়র কারও উপস্থিতি ছাড়াই পিজিটি-দের সার্জারি বা অ্যানাস্থেশিয়া করতে হয়।
ঘাটতির কারণ:
চিকিৎসকেরা এই পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। সরকারি নথিতেই দেখা যায়, গত কয়েক বছরে অনুমোদিত পদের তুলনায় প্রায় ৩৫% ঘাটতি রয়েছে শিক্ষক-চিকিৎসক পদে। অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মানস গুমটা বলেন, ‘গত কয়েক বছরে একের পর এক নতুন মেডিক্যাল কলেজ খোলা হয়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় নিয়োগ হয়নি। ফলে পুরোনো কলেজগুলিতেও ফ্যাকাল্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতামত:
মানস গুমটা মনে করেন, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের (এনএমসি) নির্দেশিকা অনুযায়ী, পিজিটি-দের হাতেকলমে শিক্ষার জন্য সিনিয়র ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানেই ওটিতে কাজ করা উচিত। কিন্তু সরকারের নিয়োগ না করার কারণেই এই নিয়ম মানা সম্ভব হচ্ছে না। মেডিক্যাল সার্ভিস সেন্টারের কলকাতা জেলার যুগ্ম সম্পাদক কবিউল হক বলেন, ‘মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এমসিআই) এর সময় শিক্ষক-চিকিৎসকের অনুপাত খতিয়ে দেখা হতো। কিন্তু এনএমসি এ ব্যাপারে তেমন নজর না দেওয়ায় সরকারের উপর নিয়োগের চাপও কমে গেছে।’
পরিসংখ্যান:
স্বাস্থ্যভবনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে আরএমও, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং প্রফেসরের মোট অনুমোদিত পদ ৫,৮৫৭টি, কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ৩,৭৮০ জন। শূন্যপদ ২,০৭৭টি। স্পেশালিস্ট মেডিক্যাল অফিসারের শূন্যপদও প্রায় ৩৫%। কবিউলের মতে, ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদের জন্য স্নাতকোত্তর পাশ ডাক্তাররা ঘুরেও ইন্টারভিউ হয় না দীর্ঘদিন। ফলে সিনিয়র ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে জুনিয়র ডাক্তাররা ওটি করবেন—সেই সিনিয়র ডাক্তার পর্যাপ্ত সংখ্যায় কোথায়?’
অন্যান্য সমস্যা:
চিকিৎসকেরা আরও জানাচ্ছেন, নতুন নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতির রাস্তাও বন্ধ। আরএমও পদে নিয়োগ বন্ধ করে সেই শূন্যপদে অস্থায়ীভাবে বন্ডে থাকা এমডি-এমএস পাশ সিনিয়র রেসিডেন্টদের কাজে লাগানো হচ্ছে। এর ফলে রোগীর চাপ আরও বাড়ছে। ওয়েস্টবেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের রাজীব পাণ্ডে বলেন, ‘পিজিটি-দের নিজে থেকে ওটি করার কথা নয়, কিন্তু আপৎকালীন পরিস্থিতিতে সিনিয়র ডাক্তারের অভাবে তাঁরা এ কাজ করতে বাধ্য হন।’
এই পরিস্থিতিতে, মেডিক্যাল কলেজগুলিতে সিনিয়র ডাক্তারের অভাব একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রোগীদের সুরক্ষা এবং জুনিয়র ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।