ডেঙ্গির ওষুধ আসা মাত্র সময়ের অপেক্ষা, ট্রায়াল হবে এনআরএস হাসপাতালে

ডেঙ্গুর প্রত্যক্ষ চিকিৎসায় আশার আলো, সিরাম ইনস্টিটিউটের নতুন উদ্যোগে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু
বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু রোগের কোনও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনও পর্যন্ত নেই। মশা বাহিত এই রোগের চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক হয়ে থাকে। তবে, এবার সেই ডেঙ্গুর প্রত্যক্ষ চিকিৎসা হাতের নাগালে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই কৃতিত্বের দাবিদার সিরাম ইনস্টিটিউট।

সিরাম ইনস্টিটিউট ডেঙ্গু ভাইরাসকে ‘নিউট্রালাইজ’ করার জন্য মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি আনতে চলেছে, যা সরাসরি চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসকে ধ্বংস করতে সক্ষম। প্রথম দুটি পর্যায়ের পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ার পর, তৃতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শীঘ্রই দেশে শুরু হতে চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনআরএস হাসপাতাল আগামী মাসে এই ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করবে। চিকিৎসকদের মতে, এই ওষুধটি বাজারে এলে সংক্রমণের জটিলতা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে এবং সিভিয়ার ডেঙ্গুকে প্রতিহত করে বহু মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে।

প্রতি বছর সারা বিশ্বের মতো ভারতেও, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ২০২২ সালে বাংলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৭,২৭১, যা গত বছর ১ লক্ষে ছাড়িয়ে যায়। এই দুই বছরে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। এই বছর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে মরশুমের শেষে এই সংখ্যা ৩৫ হাজার ছুঁয়ে ফেলবে।

অতীতে দক্ষিণবঙ্গে, বিশেষত কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকলেও, চলতি বছর উত্তরবঙ্গেও এর সংক্রমণ দেখা গেছে। জলপাইগুড়ি ও মালদায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্বাস্থ্যকর্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে দক্ষিণবঙ্গের মতো উত্তরবঙ্গেও ডেঙ্গু সমানভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ওষুধের সম্ভাবনা চিকিৎসকদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

সিরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি ‘ডেঙ্গি-শিল্ড’ নামের এই মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে সফল হলে এবং দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেলে, বহু অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অলোকেশ কোল এবং রোহিত কাপুরের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বর্তমানে বিভিন্ন ট্রায়াল সেন্টারের এথিক্স কমিটিতে এই ট্রায়ালের অনুমতির প্রক্রিয়া চলছে।

স্বাস্থ্য সূত্রে খবর, সারা দেশের ২০টি ট্রায়াল সেন্টারে ৫-১৪ বছর বয়সী শিশু এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে মোট ৬০০ জনকে এই তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জ্বর আসার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে তাদের উপর এই ডেঙ্গু মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (Dengue-mAb) থেরাপি প্রয়োগ করা হবে।

স্পনসর সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে অর্ধেককে এই থেরাপি দেওয়া হবে এবং বাকি অর্ধেককে দেওয়া হবে না। তারপর দুটি গোষ্ঠীর রোগীদের স্বাস্থ্যের উন্নতির তুলনামূলক বিচার করা হবে। এটি যেহেতু একটি ‘ডাবল ব্লাইন্ড’ ট্রায়াল, তাই কোন রোগী থেরাপি পাবেন আর কে পাবেন না, তা চিকিৎসক বা রোগী কেউই জানতে পারবেন না। এই তথ্য শুধুমাত্র স্পনসর সংস্থা সিরামের কাছে থাকবে।

জানা গেছে, প্রথম পর্বের অ্যানিমাল ট্রায়ালের পর দ্বিতীয় পর্বে হিউম্যান ট্রায়ালে প্রথমে এই মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি অস্ট্রেলিয়ায় ৪০ জনের উপর এবং পরে ভারতে ২৫০ জনের উপর প্রয়োগ করা হয়েছিল। দুটি ট্রায়ালেই এই থেরাপির সুরক্ষা নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। এখন দেখার বিষয়, ওষুধটি কতটা কার্যকর।

একটি বেসরকারি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ফেসিলিটেটর সংস্থার সর্বভারতীয় কর্তা স্নেহেন্দু কোনার বলেন, ‘অ্যান্টিবডি হল এক ধরনের প্রোটিন যা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় এবং সংক্রমণ কিংবা টিকার প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়ার পরে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবাণুকে ধ্বংস করে। সংক্রমণের শিকার হওয়ার পর অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। সেই সময় নষ্ট না করে বাইরে থেকে মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি প্রয়োগ করা হলে দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে।’ তিনি জানান, এই ট্রায়ালের লক্ষ্যও সেটাই হওয়া উচিত যে কত তাড়াতাড়ি ও দক্ষতার সঙ্গে সংক্রমণমুক্তি ঘটাতে সক্ষম নতুন এই ওষুধটি।

সংক্ষেপে, সিরাম ইনস্টিটিউটের এই উদ্যোগ ডেঙ্গু চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের সাফল্যের উপর নির্ভর করছে এই ওষুধের ভবিষ্যৎ।