বিশেষ: কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল বাশারের ক্ষমতার প্রাসাদ? জেনেনিন সম্পূর্ণ বিবরণ

হাফিজ আল-আসাদ। সিরিয়ার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। দেশটির প্রধানমন্ত্রী থেকে সর্বোচ্চ আসন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তিনি। আল-আসাদ এমন এক সময় দেশের শাসনভার কাঁধে নিয়েছিলেন, যখন অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের মতো সংকট চলছিল। তবে হাফিজ দায়িত্বভার নিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন। এরপর টানা ২৯ বছর দেশ পরিচালনা করেন। সিংহাসনের মুকুট নিয়েই ২০০০ সালের ১০ জুন মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
বাবা হাফিজের মৃত্যুর বছরই সিরিয়ার শাসনভার নেন বাশার আল-আসাদ। ক্ষমতা নিয়ে দুই যুগ দেশ পরিচালনা করেন তিনি। অর্থাৎ টানা পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সিরিয়া শাসন করে পরিবারটি।
এদিকে হাফিজ আল-আসাদকে ‘আধুনিক সিরিয়ার’ রূপকার বলা হয়। কিন্তু ৫৯ বছর বয়সী বাশার আল-আসাদকে স্বৈরাচার হিসেবে আখ্যায়িত করছে দেশটির জনগণ। কূটনৈতিকভাবে প্রাজ্ঞ হাফিজ সব দেশের সঙ্গে মোটামুটি একটা সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। সিরিয়ায় অর্থনীতিকেও এগিয়ে নেন তিনি।
বাবার ধারা বজায় রেখেছিলেন আসাদও। তার শাসনামলের শুরুর দিকে প্রশাসনিক-রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন তিনি। তবে হঠাৎই কেন ‘তাসের ঘর’ এর মতো ভেঙে পড়ল বাশারের ক্ষমতার প্রাসাদ। কেনই বা ‘স্বৈরশাসক’ খ্যাতি নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো এ নেতাকে?
হাফিজ আল-আসাদের হাতে আধুনিক সিরিয়া
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ‘খেলুড়ে’ নেতা ছিলেন হাফিজ আল-আসাদ। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে নিজ রাজনৈতিক গুরু ও সিরীয় নেতা সালাহ আল-জাদিদকে সরাতে অভ্যুত্থান ঘটান তিনি। পরের বছরই সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি।
দায়িত্ব নিয়ে ১৯৭৩ সালে মিসর-ইসরায়েল যুদ্ধে তিনি মুসলিম মিত্র কায়রোর পক্ষে অবস্থান নেন। প্রায় দুই দশক পর ১৯৯১ সালে তিনিই আবার ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। ইসরায়েলের দখলে থাকা গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখেন। টানা ২৯ বছর ক্ষমতায় থেকে ২০০০ সালের ১০ জুন দামেস্কে মারা যান হাফিজ। এরমধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের শাসনের সূচনা হয়। ঐ বছরের ১৭ জুলাই প্রেসিডেন্ট পদে বসেন তার ছেলে বাশার আল-আসাদ।
বাবার মৃত্যুতে ক্ষমতার চেয়ারে বাশার
১৯৬৫ সালে দামেস্কে জন্ম বাশার আল-আসাদের। চক্ষুবিজ্ঞানে পড়ে হতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক। তবে বাবার পথ অনুসরণ করে রাজনীতিতে আসেন তিনি।
প্রায় তিন দশকের শাসনামলে হাফিজ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজের পছন্দের ও বিশ্বস্ত লোকদের নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের মাধ্যমে দেশ শাসন করতেন তিনি। কিন্তু বাশার ক্ষমতায় এসে এ পদগুলোয় পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীতে রদবদল করেন। এরমধ্য দিয়ে প্রশাসনের লাগাম শুরু থেকেই নিজের হাতে রাখেন বাশার।
তবে সংকট দেখা দেয় ২০১১ সালে। এ সময় দেশটিতে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।
সংস্কারক থেকে কর্তৃত্ববাদী
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে সংস্কারে ভূমিকা রাখেন বাশার। প্রশাসনিক-রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে বাবার আমলের বেশ কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট হয়েও শুরুর দিকে আসাদকে সাধারণ জীবন কাটাতে দেখা যেত। ঐ সময় বাশার সিরীয়দের কাছে পছন্দের মানুষ ছিলেন। তবে পরিস্থিতি ক্রমেই বদলে যায়।
সংস্কারকের ভূমিকা থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে উঠতে শুরু করেন বাশার। বিরোধী মত দমনে তার কুখ্যাতি ছড়াতে থাকে। সিরিয়ায় গ্রেফতার করা হয় অনেক সরকারবিরোধী শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীকে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমা গণতন্ত্র সিরিয়ার জন্য নয়।’
গৃহযুদ্ধে সমালোচিত
বাশার ক্ষমতা নেয়ার আগে থেকেই সিরিয়ার তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও বাক্স্বাধীনতার অভাববোধ থেকে তুমুল হতাশা ছিল, যা উসকে দেয় আরব বসন্ত। আর এর চরম প্রতিফলন দেখা দেয় ২০১১ সালের মার্চে। সিরিয়ার দক্ষিণের শহর দেরাতে প্রথম সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়।
টানা ১৩ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সিরিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ। ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ মানবিক সংকট শুরু হয় সিরিয়ায়। এত কিছুর পরও আসাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ হয়নি। নিজের কর্তৃত্ব আরো পোক্ত করেন তিনি।
দীর্ঘ এ লড়াইয়ে আসাদের পাশে ছিল মিত্র ইরান ও রাশিয়া। লেবাননের হিজবুল্লাহও আসাদের বেশ ঘনিষ্ঠ। এতে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ঘোর আপত্তি। বেসামরিক মানুষের নির্বিচার মৃত্যু, ২০১৪ সালের সাজানো নির্বাচন, বেসামরিক মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে তুমুল বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়ে আছেন বাশার।
বিদ্রোহীদের উত্থানে বাশারের পতন
বিদ্রোহী বাহিনীর আক্রমণের মুখে দামেস্ক ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে গেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। এরমধ্য দিয়ে দেশটিতে বাশারের ২৪ বছরের স্বৈরশাসনের পতন হলো।
অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিদ্রোহীরা মাত্র ১২ দিনে পতন ঘটিয়েছে সিরিয়ার আসাদ সরকারের। তাদের দ্রুতগতির অভিযান আসাদ, তার মিত্র এবং বাকি বিশ্বকে হতবাক করেছে।
গত ২৭ নভেম্বর দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোতে বিদ্রোহীদের আক্রমণ শুরু হয়। এরপর ১ ডিসেম্বর আলেপ্পোর কুর্দি যোদ্ধাদের দখলে থাকা কিছু সংখ্যাগরিষ্ঠ কুর্দি এলাকা বাদে বাকি অংশ নিজেদের দখলে নেয় বিদ্রোহীরা। এরপরে ৫ ডিসেম্বর সিরিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম শহর হামা দখল করে ৭ ডিসেম্বর আসাদ সরকার নিয়ন্ত্রিত রাজধানী দামেস্ক ঘেরাও এর অভিযান শুরু করে বিদ্রোহীরা।