বিশেষ: নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণার আগেই নাম জানেন যিনি, জেনেনিন শিল্পীর পরিচয়?

প্রতিবছরই অক্টোবর এলে বিশ্বজুড়ে ‘ট্রেন্ডিং ইস্যু’ হয়ে থাকে নোবেল পুরস্কার। কারণ পৃথিবী সেরা সবচেয়ে মূল্যবান এবং মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার যে এটিই। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল অভূতপূর্ব কর্ম ও অসামান্য অবদানের জন্য অসাধারণ কীর্তিমানদের কপালেই জোটে এই দুর্লভ পুরস্কার।
নোবেল ঘোষণার পর বিজয়ীদের আঁকা অবয়ব দেখি আমরা। প্রত্যেকটি অলংকরণই একই রকম দেখতে বলে অনেকেই মনে করেন সেগুলো হয়তো কম্পিউটারে কোন সফটওয়্যারে আঁকা। ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই তা নয়। এই অলংকরণগুলো নিজের হাতে আঁকেন সুইডিশ ফ্রিল্যান্সার নিকলাস এলমেহেদ। তাকে ‘নোবেলজয়ীর শিল্পী’ও বলা হয়।

নিকলাস এলমেহেদের হাতে আঁকা এই ছবিগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। প্রতি বছরের অক্টোবর মাস এলেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিকোলাস। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে তাকে বিজয়ীদের ছবি পাঠানো হয়। সেগুলো চটজলদি এঁকে ফেলেন তিনি। প্রতিবার নোবেল ঘোষণার পর বিজয়ীদের আঁকা অবয়ব দেখি আমরা।

কে এই নিকোলাস?

২০১২ সালে নোবেল মিডিয়ায় যোগ দেন নিকোলাস। সে বছরই প্রথম হাতে-আঁকা নোবেলজয়ীর ছবি প্রকাশিত হয়। সেবছর যাদের স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাচ্ছিল না, তাদের ছবি আঁকার নির্দেশনা পেয়েছিলেন তিনি। দুই বছর পর নোবেল মিডিয়ার চাকরিটা ছেড়ে দিলেন শিল্পী। তবে নোবেল মিডিয়া ছাড়লো না তাকে। প্রথম বছরেই ঠিক হয়ে যায় সব নোবেলজয়ীর ছবিই এরকম হবে এখন থেকে। আর তাই গত আট বছর ধরে এই কাজ করে যাচ্ছেন নিকোলাস।

এরপর গত ১০ বছর ধরে এই কাজ করে যাচ্ছেন নিকোলাস। ২০১৭-১৮ সালে নীল আর হলুদ রঙে এঁকেছিলেন নোবেলজয়ীদের। ২০১৭ সাল থেকে সাদা-কালো মাধ্যমের সঙ্গে ধাতব ফয়েল দিয়ে সোনালি রং এনেছেন তিনি। তবে যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি না হয়ে প্রতিষ্ঠান নোবেল পায় তাহলে প্রতিষ্ঠানটির কাজকেই ফুটিয়ে তোলেন ছবিতে। যেমন, ২০২০ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিল ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’। মুঠোয় ভরা শস্যের লোগো আঁকেন নিকোলাস। নোবেল জয়ীদের ছবি সামনে এলেও পেছনেই রয়ে গেছেন প্রতিভাবান শিল্পী নিকোলাস। খুব একটা মিডিয়ার সামনে আসেন না তিনি। আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন।

বছর বছর এসব ছবি আঁকার চ্যালেঞ্জ সম্বন্ধে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এলমেহেদ বলেন, ‘বিজ্ঞানে বিজয়ীদের অনেকের ছবি পাওয়াটা বেশ কঠিন। আপনি যদি তাদের ছবি খুঁজেন, তাহলে হয়তো কোনো ওয়েব পেজে তাদের উচ্চ পিক্সেলেটেড, লো-রেজ কোনো ছবি খুঁজে পাবেন। কর্মী সদস্যদের পেজে তাদের ছবি দেখতে পাবেন, যেগুলো জঘন্য ক্যামেরা দিয়ে তোলা।

সোনালি-কালো রঙে ছবি আঁকা হয় কেন?

এত রং থাকতে পোর্ট্রেটে সোনালি রং কেন ব্যবহার করা হলো তা নিয়েও বেশ কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে অনেকের মনে। সত্যিকার অর্থে, সোনালি রঙে পোর্ট্রেট আঁকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বেশ পরে। ২০১৭ সালে প্রথমে নোবেল বিজয়ীদের নাম সোনালি রঙে প্রকাশ করার প্রাথমিক ঘোষণা দেয় নোবেল কমিটি।

তারপর নিকলাসের মনে প্রশ্ন জাগে, পোর্ট্রেটের রঙও যদি সোনালি হয়, তাহলে কেমন হয়? সেখান থেকেই সোনালি রঙের পোর্ট্রেট আঁকার শুরু। এলমেহেদ বলেন, ‘আমি বিভিন্ন সোনালি পেইন্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি এবং শেষে সোনালি ফয়েলকেই নির্বাচিত করেছি। এটি একটি অতি-পাতলা ধাতব ফয়েল, যা আপনি একটি বিশেষ আঠা দিয়ে ছবিতে লাগাতে পারেন। সাদা পটভূমিতে কালো রূপরেখাসহ আঁকা এ প্রতিকৃতিগুলোর মাঝে খুব শক্তিশালী এবং একচেটিয়া একটি ভাব আছে বলে আমার মনে হয়।’

যদিও সোনালি রং ব্যবহারে পোর্ট্রেটগুলো বেশ আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার জন্য যথেষ্ট ছিল, তাতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে কালো রঙের বর্ডারের ব্যবহার। আর ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদা রং থাকায় বিজয়ীদের ছবি হয়ে উঠেছে আরও স্পষ্ট ও শোভনীয়।

প্রচারবিমুখ এলমেহেদ

যদিও এলমেহেদ কতক্ষণ আগে বিজয়ীদের নাম জানতে পারেন, সেটি প্রকাশ করতে রাজি হননি, তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিটি প্রতিকৃতি সম্পূর্ণ করতে তার কয়েক ঘণ্টার মতো সময় লাগে।

শিল্পী নিকোলাস তিন সন্তানের বাবা। সন্তানদের সময় দিতেই বেশি পছন্দ করেন। এছাড়াও জিমন্যাস্টিকস, ফুটবল, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে তিনি খুব বেশি ভাবেন না।