বিশেষ: ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড কি ধর্ষণ ঠেকাতে পারবে? জেনেনিন কি বলছে বিশেষজ্ঞরা ?

কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদে উত্তাল গোটা ভারত। দোষীদের কড়া শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ ধরনের বর্বরোচিত ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে,মৃত্যুদণ্ড কি ধর্ষণের মতো অপরাধ দমন করতে পারবে।
পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানে ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ড ের বিধান আছে। ভারতের অনেকে এই দেশগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তারা মনে করেন, এই দেশগুলো ধর্ষণের মতো অপরাধ সহ্য করে না। তাদের সাধারণ ধারণা, এই দেশগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা ভারতের তুলনায় অনেক কম ঘটছে।
এই অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আসলে ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্তের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রক্রিয়ার দিকে নজর না দিয়ে মৃত্যুদণ্ড ের ব্যবস্থা করলেই অপরাধ বন্ধ হবে না।
মৃত্যুদণ্ডের কারণে কী পাকিস্তানে ধর্ষণের অপরাধ কমেছে?
পাকিস্তানের লাহোরে আইনী সহায়তা দেয়ার একটি প্রকল্পের জাইনাব মালিক বলেছেন, যদিও পাকিস্তানের আইনে ধর্ষণকে সন্ত্রাসের সমতুল্য বিবেচনা করা হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। কারণ শাস্তি যাই থাকুক না কেন, বিচার না হওয়ায় ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
তিনি আরো বলেছেন, পুলিশ নারীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করে। গণধর্ষণের ক্ষেত্রে পুলিশ সংঘবদ্ধ পুরুষদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চায় না।কারণ অনেক পুরুষে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।এ ধরণের ঘটনায় পুলিশ প্রায়ই একজনের বিরুদ্ধে মামলা নেয়।
পাকিস্তানের নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারিরা বলেছেন, অনেক সময় পুলিশ অপরাধীর পক্ষে দালালের ভূমিকা নিয়ে সমঝোতা করার চেষ্টা চালায়। এছাড়া ধর্ষণের শিকার বা ক্ষতিগ্রস্তকে হুমকি দিয়ে বা জোরপূর্বক অভিযোগ প্রত্যাহার করানোর চেষ্টাও পুলিশ করে থাকে।যাতে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি হতে না হয়। বাংলাদেশেও একই ধরণের উদ্বেগ রয়েছে।
দেশটির সংসদ ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এসিড হামলা এবং নারী ও শিশু পাচারের মতো অপরাধের জন্য কঠোর কিছু শাস্তি এবং মৃত্যুদণ্ড ের ব্যবস্থা রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রনয়ন করেছিল ১৯৯৫সালে। কিন্তু অনেক সময় যথাযথ তথ্য প্রমাণের অভাবে অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। ফলে অনেক ঘটনায় অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বোঝা
ভারতে মানবাধিকার নিয়ে আন্দোলনকারিদের অনেকে ধর্ষণের দায়ে মৃত্যুদণ্ড ের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার বা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এই বিধান বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
সামাজিক ন্যায়বিচার সর্ম্পকিত একটি প্রকল্পের ড: অনুপ সুরেন্দ্রনাথ বলেছেন, অনেক ঘটনা প্রকাশ হয় না।কারণ বেশিরভাগ ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীরা ক্ষতিগ্রস্তের আশেপাশের এলাকার বা পরিচিত হয়ে থাকে, তারা ভয়ভীতি দেখানোসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্তকে উদ্বেগের মধ্যে রাখে। এ ধরণের পরিস্থিতিতে অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত এবং তার পরিবার ঘটনা প্রকাশ করে না।
ক্ষতিগ্রস্তরা সামাজিক দিক থেকেও প্রতিকুল পরিবেশের মুখোমুখি হয়।সেখানে মৃত্যুদণ্ড ের শাস্তি ক্ষতিগ্রস্তের উপরই নানাদিক থেকে চাপ বাড়বে বলে মনে করেন ড: সুরেন্দ্রনাথ।
বছরের পর বছর বিচারের জন্য অপেক্ষা
ভারতে বিচারের ধীরগতি একটা বড় ইস্যু। ক্ষতিগ্রস্তকে বিচার পেতে বছরের বছর অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে মৃত্যুদণ্ড হলে অপরাধীর উচ্চআদালতে যাওয়া বা আপিল করার সুযোগ থাকে। তাতে অপরাধীও অনেক সময় পাবে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
দিল্লীতে চলন্ত বাসে মেডিকেল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার আলোচিত ঘটনায় বিচারিক আদালতে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হয় ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে। এখনো সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নিস্পত্তি হয়নি।