বিশেষ: ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ থাকলেও নেই একতা, বিশ্বের সবচেয়ে ‘বিভক্ত’ অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়া

গোটা বিশ্বের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি বিভক্ত এবং এদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ফরেন সার্ভিস বিভাগের অধ্যাপক ড. ইরফান নূরউদ্দিন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্বায়ন, গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রায়ন এবং সংঘাত নিরসন বিষয়ে একাধিক গবেষণা করা এই গবেষক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে কম সমন্বিত ও সংযুক্ত (লিস্ট ইনটিগ্রেটেড) অঞ্চল হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া। এখানে এক দেশ থেকে আরেক দেশের মধ্যে চলাচল বা আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ যতটা কঠিন আর জটিল, তেমনটা সারা পৃথিবীর আর কোনও অঞ্চলে নেই।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের অনুন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যেও যে পরিমাণ আন্তঃবাণিজ্য হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ তার চেয়েও কম। অথচ ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ থাকেন শুধু এই কয়েকটি দেশে, অনায়াসে তা বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থল (ইকোনমিক হাব) হয়ে উঠতে পারত।
এর নেপথ্যে কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভারতবিষয়ক এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আরো বলেন, এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী দেশ ভারতের সঙ্গে বাকিদের সম্পর্ক যে সহজ আর স্বাভাবিক নয়, এটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। আর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কাটাছেঁড়া করলে দেখা যায় মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা বা নেপাল – কোনও প্রতিবেশীর ক্ষেত্রেই তারা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে বহুমাত্রিক (মাল্টি ডাইমেনশনাল) কোনও নীতি নিয়ে কখনও এগোয়নি। বরাবর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে স্বল্পকালীন স্বার্থ বা শর্ট-টার্ম ইন্টারেস্টকে, আর তার জন্য সংকীর্ণ, সন্দেহদুষ্ট একটা একমাত্রিক নীতি নিয়েই এগোনো হয়েছে।’
বর্তমানের নরেন্দ্র মোদির সরকার যেমন তাদের ‘হিন্দু আইডেন্টিটি’কে পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে – আর সেটা যথারীতি হিতে-বিপরীত হয়েছে বাংলাদেশের মতো একাধিক মুসলিম-প্রধান দেশে।
বিজেপি সরকারের আনা নাগরিকত্ব আইনের মূল লক্ষ্যই ছিল তাই, ভারতীয় রাষ্ট্রকে হিন্দুদের অন্তিম আশ্রয় হিসেবে তুলে ধরা। বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা দেশের ভেতরে ‘বাংলাদেশি’ শব্দটাকে অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীর প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করেছেন অনবরত, আর অন্য দিকে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দারুণ উন্নত হয়েছে বলে ক্রমাগত দাবি করে গেছেন। কিন্তু এই দুটোর মধ্যে একটা মারাত্মক স্ববিরোধিতা আছে, যেটা বেশি দিন ধামাচাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, গত এক দশকে আমরা ভারতের প্রতিবেশী অনেকগুলো দেশেই দেখেছি সে দেশের সরকার হয়তো ভারতের প্রতি খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ – কিন্তু সে দেশের সাধারণ মানুষ ভারত-বিরোধিতায় ফুঁসছেন। এই একই জিনিস বাংলাদেশ, নেপাল এবং মালদ্বীপেও ঘটেছে।
কিন্তু স্থিতিশীলতা বা গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ভারত কখনও সে সব দেশের মানুষের ক্ষোভ বা চাওয়া-পাওয়াকে বোঝার চেষ্টা করেনি, বরং ধরে নিয়েছে ওই দেশের সরকার পাশে থাকলেই তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।
আর এর কারণটাও সহজ, যেটা আগেই বললাম – ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোতে নিজেদের স্বল্পকালীন স্বার্থের হিসেব করেই এগিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে কী হবে তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামায়নি। আর একটার পর একটা দেশে তার পরিণামও ভুগতে হচ্ছে তাদের।
ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট ছোট দেশগুলোর অধিকাংশ নাগরিক এবং সরকারের একাংশ ভারতকে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে দেখে।
নিজেকে একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে নয়াদিল্লিকে অবশ্যই এই দেশগুলোর প্রতি নৈতিক কিছু দায়িত্বও পালন করতে হবে এবং একটা ‘বহুমাত্রিক’ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। যে প্রচেষ্টা অন্তত বিজেপি সরকারের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।