মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা আক্রান্ত হয়েও যেভাবে বাঁচল ভারতীয় কিশোর

মস্তিষ্কোখেকো অ্যামিবা আক্রান্ত হয়েও বিস্ময়করভাবে বেঁচে ফিরেছেন ভারতের কেরালা রাজ্যের ১৪ বছরের এক কিশোর। আফনান জসিম নামের এই কিশোর বিশ্বে অ্যামিবা সৃষ্ট মারণ রোগে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে যাওয়া গুটিকয়েক সৌভাগ্যবানদেরই একজন।
তার এই বেঁচে ফেরাতে কিছুটা হলেও অবদান আছে তার বাবার। যিনি স্যোশাল মিডিয়ায় এই রোগ নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার দেখেছিলেন।
বিবিসি জানায়, আফনান কোঝিকোড় জেলার একটি গ্রামের স্থানীয় পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন। এর পাঁচ দিন পরই দেখা দেয় রোগের লক্ষণ। তীব্র মাথা ব্যথা এবং খিঁচুনি হতে শুরু করে তার।
আফনানের বাবা-মা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। সৌভাগ্যক্রমে আফনানের বাবা এম কে সিদ্দিকীর মনে পড়ে যায় স্যোশাল মিডিয়ায় দেখা রোগের এমন লক্ষণগুলোর কথা।
দুগ্ধ খামারি সিদ্দিকী বলেন, “আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গের কথা পড়ছিলাম- সম্প্রতি এ ভাইরাসে কেরালায় এক বালক মারা গেছে- তখনই মগজখোকো অ্যামিবা সম্পর্কেও আমি জানতে পারি। আমি সংক্রমণের কারণে খিঁচুনির কথাও পড়েছিলাম।”
“আফনানের খিঁচুনি শুরু হলে আমি তাকে স্থানীয় একটা হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপরেও ওর খিঁচুনি বন্ধ না হওয়ায় তাকে অন্য একটি হাসপাতালে নিই। কিন্তু সেখানে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন না।”
শেষমেষ আফনানকে নেওয়া হয় বেবি মেমোরিয়াল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক আব্দুল রউফ তাকে দেখেন। বিবিসি-কে রউফ বলেন, লক্ষণ দেখে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই রোগ শনাক্ত করা হয়েছিল।
সিদ্দিকী চিকিৎসককে বলেছিলেন, পাঁচ দিন আগে আফনান পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়েছিল। এরপরই সে মাথা যন্ত্রণার কথা বলে এবং পরে তার জ্বরও আসে।
একথা বলার কারণেই রোগ সময়মত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক রউফ।
মস্তিষ্কে আক্রমণকারী এই আণুবীক্ষণিক জীবাণু যে রোগ সৃষ্টি করে তাতে মৃত্যুর হার ৯৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ বলছে, ১৯৭১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মাত্র চারটি দেশ- অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও পাকিস্তানে এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েও বেঁচেছেন মাত্র আটজন।
আক্রান্ত হওয়ার নয় ঘণ্টা থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে এ রোগ ধরা পড়লে তবেই বেঁচে ফেরা সম্ভব। বেঁচে যাওয়া ৮ জনেরই এই সময়ের মধ্যে রোগ শনাক্ত হয়েছিল। ভারতীয় কিশোর আফনান জসিম এই তালিকায় বেঁচে ফেরা নবম জন।
অ্যামিবা হচ্ছে- নিগলেরিয়া ফওলেরি নামক এক ধরনের প্যারাসাইট (পরজীবী), যা নাক দিয়ে মানবদেহে ঢোকে। এরপর মাথার খুলির কাছের ক্রিব্রিফর্ম প্লেটের মাধ্যমে এটি পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। বিভিন্ন রাসায়নিক নিঃসরণ করে এটি মস্তিষ্ককে নষ্ট করে দেয়।”
চিকিৎসক রউফ বলেন, “মিষ্টি পানিতে, বিশেষত একটু উষ্ণ জলাশয়ে অ্যামিবা থাকে। তাই কেউ যাতে জলাশয়ের জলে ঝাঁপিয়ে না পড়েন বা ডুব না দেন। কারণ, এভাবেই অ্যামিবা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।”
তিনি জানান, আফনানকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তার আগে এ রোগে কেরালায় তিনজনের মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল। আরও একজন সংকটজনক অবস্থায় ছিল।
রউফ বলেন, “আমাদের হাসপাতালে দুইজনের মৃত্যু হওয়ার পর আমরা সরকারকে জানাই যে, এটি একটা জনস্বাস্থ্য মূলক সমস্যা এবং এর সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো উচিত।” আর এই সচেতনতামূলক প্রচারই দেখেছিলেন আফনানের বাবা।