সত্যিই কি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াচ্ছে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল, কি বলছে সর্বশেষ পরিস্থিতি?

গাজায় ইসরায়েলি হামলার নয় মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ নেই। এর মধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর এ মুখোমুখি অবস্থানের কারণে সংঘাতের তীব্রতা ও মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে দুই পক্ষ যে কোনো সময় সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়তে পারে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহর বিচরণক্ষেত্র হওয়ায় আঞ্চলিক সংঘাতের প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে লেবানন। সেই দিকে থেকে লেবানন এই মুহূর্তে একটা বিপজ্জনক পর্ব পার করছে। দেশটি খাদের এমন কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে যে সামনে পা বাড়ালেই অতল গহ্বরে পড়ে যেতে হবে।
কেননা লেবাননকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করা ইসরায়েলের পক্ষে কঠিন কিছু হবে না। কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক পতনের কারণে দেশটির বৈদ্যুতিক লাইনব্যবস্থা ইতোমধ্যেই বিকল হয়ে পড়েছে। এটি কোনমতে কাজ করছে। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা সহজেই এটিকে শেষ করে দিতে পারে।
তবে দিনের মধ্যে হিজবুল্লাহর ক্ষমতা কেড়ে নিতে অবশ্য অনেক দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। কেননা, ২০০৬ সালের সেই অমীমাংসিত যুদ্ধের পর থেকে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সঙ্গে আবারো একটি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। পিছিয়ে নেই হিজবুল্লাহও। দীর্ঘদিন ধরে তারাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জানা গেছে, হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি ও দোরগোড়ায় তাদের উপস্থিতি বিবেচনায় গাজার হামাস থেকে হিজবুল্লাহকে ইসরায়েল তাদের অস্তিত্বগত হুমকি বলে মনে করে। জটিল এ পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েলের ওপর নয়, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের বৃহত্তর স্বার্থের ওপর ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
আপাতভাবে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল—দুই পক্ষের কারোরই বিপজ্জনক সীমারেখা অতিক্রমের অভিপ্রায় নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা এবং গাজা সংঘাতের কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দুই পক্ষের কোনো একটা পক্ষ বড় কোনো ভুল করে বসতে পারে। তাতে যেকোনো সময়ই সরাসরি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে।
ইসরায়েলি অনুমান অনুসারে, গোষ্ঠীটির অস্ত্রাগারের মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট রয়েছে। ইতোমধ্যেই অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত সেগুলোর মধ্যে ৫ হাজারটি নিক্ষেপ করেছে হিজবুল্লাহ। যার অর্থ, গোষ্ঠীটির অস্ত্রাগারের বেশিরভাগ অংশই অক্ষত রয়েছে। গত সপ্তাহে একটি বক্তৃতায় হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহও এমনটাই বলেছিলেন।
সশস্ত্র এই গোষ্ঠীর হামলার পারদর্শিতায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবাক হয়েছেন। এর মধ্যে সীমান্তে ইসরায়েলের নজরদারি আউটপোস্টে নিয়মতান্ত্রিক নিখুত হামলা, আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনগুলোকে গুলি করা এবং ইসরায়েলের আয়রন ডোম ব্যাটারি ও ড্রোন-বিরোধী প্রতিরক্ষাগুলোতে আঘাত করার দক্ষতা অন্যতম।
তবে, ইসরায়েলের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের ঘটনা ছিল অনলাইনে হিজবুল্লাহ প্রকাশিত নয় মিনিটের ড্রোন ফুটেজ। ওই ফুটেজে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় হাইফা শহর এবং এর আশেপাশে অত্যন্ত সংবেদনশীল বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোর চিত্র দেখানো হয়।
অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও যুদ্ধের ময়দানে হিজবুল্লাহ সম্ভবত ৪০ থেকে ৫০ হাজার যোদ্ধা নামাতে সক্ষম। নাসরাল্লাহ সম্প্রতি এই সংখ্যা ১ লাখেরও বেশি বলে দাবি করেছেন। এই যোদ্ধাদের মধ্যে অনেকেরই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে শাসক বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অন্য অনেক গেরিলা গোষ্ঠীর মতো নয় হিজবুল্লাহ। একটি যোদ্ধা বাহিনী হিসেবে এর গোষ্ঠীটি উচ্চ প্রশিক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ।
যে কারণে দৃশ্যমানভাবে তীব্র হওয়া উত্তেজনা ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর পাশাপাশি অবস্থান, কত দিন টেকসই থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধ এখন না–ও বাধতে পারে। কিন্তু আসন্ন দিনগুলোতে বড় কোনো সংঘাতের কালো ছায়া মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ঝুলছে।