মালবাহী ট্রেনের চালকের কাছেও ছিল ‘অনুমতি’! তাহলে দুর্ঘটনার দায় কার?

পশ্চিমবঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি লাইন থেকে আকাশের দিকে উঠে যায়। অন্যদিকে মালবাহী ট্রেনটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। বয়াবহ এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ যাত্রী।
সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, দুর্ঘটনায় মালবাহী ট্রেনের চালক মারা গেছেন। সহ-চালক জীবিত আছেন, তবে তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার গার্ডও মারা গেছেন। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় রেলওয়ে মেল সার্ভিসের (আরএমএস) এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নিহত বাকিরা কাঞ্চনজঙ্ঘার যাত্রী।
এদিকে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পেছনে প্রাথমিকভাবে মালবাহী ট্রেনের চালকে দায়ী করা হলেও এবার সামনে এসেছে কিছু নতুন তথ্য। মালবাহী ট্রেনের চালকের কাছেও ছিল ‘অনুমতি’! রেলের পরিভাষায় একে বলে ‘পেপার লাইন ক্লিয়ার টিকিট’ (পিএলসিটি)।—তাহলে দুর্ঘটনার দায় কার?
রেল সূত্রে খবর, সোমবার ভোর থেকেই রাঙাপানি এবং চটের হাট অংশে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা বিকল। ওই অংশে তাই ট্রেন চলাচল হচ্ছিল কাগুজে সিগন্যালে। রেলকর্মীদের একাংশের মতে, দুর্ঘটনার কবলে পড়া মালগাড়ির চালক সিগন্যাল মানেননি! প্রশ্ন উঠছে, সত্যিই কি দোষ ছিল তার? যদি মালবাহী ট্রেনের চালকের কাছে কাগুজে অনুমতি থাকে তবে গলদ কোথায় ছিল?
রেলের একটি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল অকেজো হওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং মালবাহী ট্রেন, দুই ট্রেনের চালক এবং গার্ডকেই কাগুজে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। রাঙাপানি স্টেশনের স্টেশন মাস্টারই ওই কাগুজে অনুমতি দিয়েছিলেন।
রেল সূত্রে খবর, কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশাপাশি মালবাহী ট্রেনের চালককেও ‘টিএ ৯১২’ ফর্ম দেওয়া হয়েছিল। সেই ফর্মে উল্লেখ ছিল কোন কোন সিগন্যাল ‘ভাঙতে’ পারবেন চালক। এমনকি, কোথা থেকে কোন পর্যন্ত এই ‘অনুমতি’ বহাল থাকবে, তাও উল্লেখ ছিল।
মালবাহী ট্রেনের চালক ও গার্ডের কাছেও ছিল সেই ছাড়পত্র। সাধারণত, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা খারাপ হয়ে গেলে ওই নির্দেশের ভিত্তিতেই ট্রেন চালিয়ে থাকেন চালক। সিগন্যাল লাল থাকলেও নিয়ন্ত্রিত গতিতে ট্রেন চালাতে পারেন তিনি। সোমবার সকালের দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, কাগুজে সিগন্যাল পেয়েও নিয়ম মেনেই কি মালগাড়ির চালক ট্রেন চালাচ্ছিলেন?
রেলের ওই সূত্রে আরও দাবি করেছে, রাঙাপানি থেকে চটের হাট পর্যন্ত মোট ৯টি রেড সিগন্যাল ‘ভাঙা’র অনুমতি ছিল মালগাড়ির চালকের কাছে। মালগাড়ির চালক ও গার্ডকে স্টেশন মাস্টার অনুমতি দিয়েছিলেন, এ৫-৬৫৪, এ৫-৬৫২, এ৫-৬৫০, এ৫-৬৪৮, এ৫-৬৪৬, এ৫-৬৪৪, এ৫-৬৪২, এ৫-৬৪০ এবং এ৫-৬৩৮ সিগন্যাল ‘ভাঙা’ যাবে।
অনুমতিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল, চালককে অবশ্যই নজর রাখতে হবে যাত্রাপথের লেভেলক্রসিং গেটের উপর। যদি গেট বন্ধ থাকে তবেই ট্রেন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন চালক।
গেট খোলা থাকলে তার আগেই ট্রেনকে থামিয়ে দিতে হবে তাকে। নিয়ম অনুযায়ী, কাগুজে সিগন্যালে ট্রেন চালানোর সময় দিনের বেলা দৃশ্যমানতা ঠিক থাকলে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিবেগে ট্রেন চালানো যায়। একই সঙ্গে আগের গাড়ির সঙ্গে অন্তত ১৫ মিনিটের দূরত্বে পরের গাড়িকে যেতে হবে।
রাতের বেলা বা কুয়াশা থাকলে ওই গতি ১০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মালগাড়ির চালক সেই নিয়ম মেনেছিলেন কি না তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। রেলের পক্ষ থেকে এখনও এ নিয়ে সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি।
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজ ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক করাই এই মুহূর্তে প্রাথমিক লক্ষ্য। বাকিটা তদন্তসাপেক্ষ।