বিশেষ: ভারতের নতুন সরকার কি পারবে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে? জেনেনিন বিস্তারিত

লোকসভা নির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। নির্দ্বিধায় বলা যায়, মোদির মতো এত আলোচিত, সমালোচিত, নন্দিত, নিন্দিত ও বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী ভারত দেখেনি। তার মতো নির্বাচনী সাফল্যও আর কেউ পাননি। রাজ্য ও কেন্দ্রে এমন দাপটের সঙ্গে টানা রাজত্বও কেউ করেননি।জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি ব্যবসায়িক বিশ্বেও নিজের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। যদিও তিনি একটি চলমান সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন-দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কিভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়। নির্বাচনের পরে মোদি সেই একই ধাঁধার উত্তর খুঁজে চলেছেন।

ভারত বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশের মধ্যে অন্যতম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের বেকারত্বের হার অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকেও ছাড়িয়েছে, যা দেশটিকে দ্রুত অর্থনৈতিক উত্তোরণের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

মোদি প্রশাসনের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান, যিনি এখন ওয়াশিংটনের পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের সিনিয়র ফেলো, তিনি বলেছেন, দেশটিতে গত চার-পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের গতি দুর্বল হয়েছে। এটি সত্যিই ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক বড় চ্যালেঞ্জ। আমি মনে করি, সরকারের সামনে এ সমস্যা সমাধানের বড় কোনো সুযোগ নেই।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তত গত তিন দশকে বেকারত্বের এত চরম পরিস্থিতি হতে দেখা যায়নি। এ কারণে মোদির দলের প্রতি জনগণের হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশটিতে সম্পদের বিস্ময়কর বৈপরীত্য হচ্ছে আরো প্রকট।

মুম্বাইয়ের একটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি জানায়, দেশটিতে কর্মজীবী ​​জনসংখ্যা প্রায় এক বিলিয়ন। এর মধ্যে ভারতে মাত্র ৪৩০ মিলিয়ন চাকরি রয়েছে। আবার এদের মধ্যে বেশিরভাগ লোকই দিনমজুর এবং খামারের শ্রমিক। নির্ভরযোগ্য মজুরি এবং সরকারি কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষার অভাবে তাদের জীবন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আটকে আছে।

উন্নত জীবনযাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট হলেও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি চাকরির উৎসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন, এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তি গৌতম আদানির মতো বিজনেস ম্যাগনেটরা মোদির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং ভাগ্যের জোড়ে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করে নিজেদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে উন্নত করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ভারতীয় কর্মী যারা তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, তারা কার্যকরভাবে বিপর্যস্ত-রাস্তার ধারের স্টলে, ছোট দোকানে যারা কাজ করেন তাদের আয়ের কোনো নিশ্চয়তা বা অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই।

কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, অর্থের বিক্ষিপ্তকরণের জেরে কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প দুর্বল হতে পারে। গ্লোবাল ডেটা টিএস লম্বার্ড-এর প্রধান ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সুমিতা দেবেশ্বরের মতে, আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাবে, মানুষ যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবিধা না পায়, তবে এটি মূলত স্থবিরতা সৃষ্টি করে।

অর্থনীতিবিদ সুব্রামানিয়ান বলেছেন, সমগ্র উৎপাদন খাত ভারতকে বাইপাস করেছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি সেই বৃহত্তর ব্যর্থতা, যা ভারতকে ক্রমাগত তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

জানা গেছে, এ সমস্যার সমাধানের পথ হিসেবেই মোদি উৎপাদনকে জোরদার এবং রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বন্দরগুলোকে সুগম করেছেন, প্রশাসনিক প্রবিধানকে সহজ করেছেন। কিছু হাই-প্রোফাইল উন্নয়ন, ভারতের বাজারে অ্যাপল আইফোনের দৃশ্যমান উপস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, উৎপাদন দেশের অর্থনীতির মাত্র ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি এক দশক আগের তুলনায় কম, যখন মোদি ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন।

শেয়ারের দাম বহুগুণ করে, বিদেশি অর্থ ভারতের স্টক মার্কেটে প্রবাহিত হয়েছে, যা মোদির ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের একটি মূল উপাদান। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় কোম্পানিগুলোতে সরাসরি অর্থ দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করা- একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাজি হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল মুসলিমদের কোণঠাসা করে সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

ধারণা করা হচ্ছে, চলতি নির্বাচন অতিরিক্ত বিনিয়োগকে আরো নিরুৎসাহিত করতে পারে, কারণ মোদির সম্ভবত ব্যবসা সংক্রান্ত স্থবির সংস্কারগুলো পাস করা আরো কঠিন হবে। যার মধ্যে জমি সংগ্রহ করা বা ভাড়া করা এবং শ্রমিকদের নিয়োগ সংক্রান্ত আইন সম্পৃক্ত। অর্থনৈতিক গতিশীলতার দিকে কোনো সুস্পষ্ট পথ না থাকায় এবং আরো চ্যালেঞ্জিং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, মোদি হয়তো সমর্থন জোগাড় করার ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতি নেবেন। তিনি সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি প্রসারিত করতে পারেন, প্রয়োজনে সম্প্রদায়ের কাছে আরো নগদ হস্তান্তরের জন্য সরকারি কোষাগার ব্যবহার করবেন। এই ধরনের একটি পদক্ষেপ সম্ভাব্যভাবে সরকারের কর্মসূচির অগ্রগতির জন্য উপলব্ধ তহবিল হ্রাস করতে পারে- যার মধ্যে হাইওয়ে, বন্দর, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য অবকাঠামোর নির্মাণ জড়িত। এই পরিকল্পনাগুলো ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য এবং উৎপাদনে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য বিস্তৃত প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু।

ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের উৎপাদন খাতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বাণিজ্য শত্রুতায় জড়িত, বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্য তৈরির জন্য চীনা কারখানার উপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। ওয়ালমার্টের মতো বড় খুচরা বিক্রেতারা চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতকে ক্রমবর্ধমানভাবে খুঁজছে।

তবে সম্ভাব্য বিনিয়োগের চাহিদাগুলোকে ধরে রাখার জন্য হাইওয়ে, রেল সংযোগ এবং বন্দরগুলোর আপগ্রেডিং অব্যাহত রাখা এবং কারখানার কাজ করার জন্য লোকেদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়াতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের উপর ফোকাস করা প্রয়োজন।