দ্য ক্রাইং বয় : যে ছবি দেওয়ালে টাঙালেই আগুনে পুড়তো বাড়ি, আজ কাটেনি সেই রহস্য!

সময় ১৯৮৫ সাল, নভেম্বর মাস। সে সময় ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় বিপুল পরিমাণে ‘দ্য ক্রাইং বয়’ নামের ছবি পোড়ানো শুরু হয়েছিল। যাকে বলে বন ফায়ার। ‘দ্য ক্রাইং বয়’ শিরোনামের এ ছবিটি ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক রহস্যঘেরা গল্প। শুনলে মনে হবে হরর ছবি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি এ বলকের ছবি ঘরে রাখলে বিপদ হবেই।
ইউরোপ জুড়ে আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করেছে ঐ ছবি। বলা হচ্ছে, ওই ছবির কপি যদি আপনি শখ করে টাঙিয়ে ফেলেন ঘরের দেয়ালে, তাহলেই আর রক্ষা নেই। যারা এ ছবি ঘরের দেয়ালে টঙিয়েছে তাদের বাড়িই আগুনে পুড়ে গেছে। অথচ সেই বাড়ির দেয়ালে টাঙানো ‘দ্য ক্রাইং বয়’ ছবিটির গায়ে আঁচও লাগেনি! এতে ছবিতে থাকা বালক পেয়ে যায় ‘মৃত্যুদূত’ তকমা।

ইতালির শিল্পী জিওভানি ব্রাগোলিনের আঁকা ‘দ্য ক্রাইং বয়’। গত শতকের পাঁচের দশক থেকে হু হু করে বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য ঐ ছবিটি ছিল একটি সিরিজের অন্তর্গত। কেবল ঐ বালকই নয়, আরও নানা ক্রন্দনরত বালক-বালিকাদের ছবিও এঁকেছিলেন জিওভানি। কিন্তু সব ছবির মধ্যে থেকে আলাদা করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অসহয় বালকের কান্নার ছবিটি। জানা যায়, পরবর্তী তিন দশকের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি বিক্রি হয়েছিল অভিশপ্ত বালকের পোট্রেট। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে ছবিটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আটের দশকে এসে শুরু হল গুঞ্জন।

১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’-এ প্রকাশিত হয় একটি সংবাদ। তাতে এসেক্সের এক দমকলকর্মীকে দাবি করতে শোনা যায়, আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া কয়েকটি বাড়ির ভিতরে তিনি দেখতে পেয়েছেন অবিকৃত ‘দ্য ক্রাইং বয়’ পেন্টিং। এই একটি প্রতিবেদনই যেন কাজ করল স্ফুলিঙ্গের মতো। ‘ভূতুড়ে’ ছবি ঘিরে শোরগোল পড়ে গেল চারিদিক।

পরিস্থিতি এমন যে, মাস দুয়েকের মধ্যেই বন ফায়ার করে পুড়িয়ে দেওয়া হল ছবিটির অনেক কপি। কারণ, অভিশাপের হাত থেকে বাঁচতে মরিয়া মানুষদের অসহায়তা ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপজুড়ে।আসলে এই ধরনের গুঞ্জন একবার ছড়িয়ে পড়লে দাবানলের মতো তা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

যেমন, ‘দ্য হ্যান্ডস রেসিস্ট হিম’। ১৯৭২ সালে বিল স্টোনহ্যামের আঁকা এই ছবিতে এক ছোট্ট ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার পাশে রয়েছে একটি মেয়ে পুতুল। আর পিছনে ছিল একটি দরোজা। সেই দরোজাটি বাস্তব দুনিয়া ও ফ্যান্টাসির জগতের মাঝের দরজা। পুতুলটি ওই ছেলেটিকে ওই জগতে নিয়ে যেতে এসেছে। এমন সুন্দর একটি ছবিকে ঘিরেও আছে রহস্য। ২০০০ সালে মার্কিন বহুজাগতিক ই-কমার্স সংস্থা ‘ইবে’ নিলামে তোলে ছবিটি। দাবি করে, ছবিটি অভিশপ্ত। রাতের অন্ধকারে নাকি ছবি থেকে বেরিয়ে এসে হাঁটতে শুরু করে ছেলেটি। ঘটতে থাকে নানা ভয়ংকর ঘটনা। নেমে আসে দুর্যোগের কালো মেঘ। কিন্তু এই ছবিটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া মিথও ‘দ্য ক্রাইং বয়’-এর কাছ যেন কিছু না!

গুঞ্জন আছে, ছবির ঐ ছেলেটি নাকি স্পেনীয় জিপসি পরিবারের ডন বনিলোর। কেউ বলে ডায়াব্লো। বনিলোর বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন আগুনে পুড়ে। এরপর যারাই ছোট্ট ছেলেটিকে আশ্রয় দিয়েছেন পরিবারে, আগুনে পুড়ে গিয়েছে তাদের ঘরবাড়িও! এমনকী, ছেলেটির ছবি আঁকা হয়েছিল যে স্টুডিওয়, সেটিও নাকি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল! এমনকী, এমনও মিথ শোনা যায়, ছোট্ট ছেলেটি নিজেও মারা গিয়েছিল আগুনে পুড়ে।

তা বলে সত্য়িই কি ছবিটি ‘অভিশপ্ত’? এমন কি আদৌ হতে পারে? যুক্তিনিষ্ঠ মানুষের পক্ষে এই দাবি হজম করা সম্ভব না। সবচেয়ে বড় যুক্তিটি দিয়েছিলেন ব্রিটিশ লেখক ও কৌতুকশিল্পী স্টিভ পান্ট। বিবিসি রেডিওতে তিনি একটি শো করতেন যার নাম ‘পান্ট পিআই’। সেখানে একটি এপিসোডে তিনি আলোচনা করলেন ক্রন্দনরত বালকের মিথ নিয়ে। আর যুক্তি দিলেন, ওই ছবিগুলির প্রিন্টে অগ্নিনির্বাপক পদার্থের সাহায্যে বার্নিশ করা হয়েছিল। ফলে আগুনে ঘর বাড়ি পুড়লেও ছবিটি পুড়তো না।

পান্টের এমন সব যুক্তিতেও অবশ্য পরিস্থিতি বদলায়নি। বরং ক্রমেই ঐ ছবির শরীরে অভিশপ্ততম চিত্রকর্মের জলছাপ আরও জোরাল হয়েছে। ইউরোপ থেকে পৃথিবীর সব মহাদেশের বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে ‘দ্য ক্রাইং বয়’কে ঘিরে তৈরি হওয়া মিথ। যা শুনলে আজও মানুষ বিষ্ময়ে ভাবতে বসে, এ কি করে সম্ভব!