বিশেষ: যৌনদাসী রেখেই ক্ষান্ত হতেন না, তরুণীদের যা করতে বাধ্য করতেন এই বিতর্কিত ‘গুরু’

তিনি ছিলেন একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদ। এরপর স্বঘোষিত নারীবিদ্বেষী গুরু হয়েছেন। রোমানিয়ার ধনকুবের অ্যান্ড্রু টেটকে নিয়ে বিতর্ক ছিল বহু দিন ধরেই। প্রকাশ্যে বার বার কটু কথা বলেও কীভাবে পার পেয়ে যান টেট, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল অনেকের মনেই। ২৯ ডিসেম্বর ধর্ষণ ও নারী পাচারের মতো মারাত্মক অভিযোগে বুখারেস্ট থেকে গ্রেফতার হয়েছেন তিনি।
রীতিমতো ওয়েবসাইট খুলে নারীদের যৌনাচারের ভিডিও প্রচার করতেন অ্যান্ড্রু ও তার ভাই ত্রিসতান। সঙ্গে চলত নিজেদের নারীবিদ্বেষী মতবাদের প্রচার। ‘হাসলার ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি ওয়েবসাইট থেকে সেই মত প্রচার করতেন দুই ভাই। অভিযোগ এসবের সঙ্গে চলত নারী পাচারও। এভাবেই কমপক্ষে আটশো কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠেন অ্যান্ড্রু টেট।
ডিসেম্বর মাসে এক নারী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, টেট দিনের পর দিন তাকে আটকে রেখে যৌন হেনস্থা করেছেন। বলপূর্বক যৌনাচারের ভিডিও তোলেন। তার পরেই তদন্ত শুরু করে রোমানিয়া প্রশাসন। প্রাথমিক তদন্তের পর রোমানিয়া প্রশাসনের অভিযোগ, অন্তত ৬ জন নারীকে আটকে রেখেছিলেন টেট এবং তার সঙ্গীরা।
প্রাথমিক তদন্তের পর রোমানিয়া প্রশাসন জানিয়েছে, এর আগে ২০১৫ সালেও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল টেটের বিরুদ্ধে। সে সময় ব্রিটেনে ছিলেন তিনি। অভিযোগ থেকে বাঁচতে তিনি পালিয়ে রোমানিয়া চলে যান বলে অভিযোগ।
৬ জন অভিযোগকারিণী প্রশাসনকে জানিয়েছেন, প্রেমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফাঁসানো হয় তাদের। প্রথমে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে তার পর শুরু হত যৌন উৎপীড়ন। এর পর তাদের নিয়ে যাওয়া হত বুখারেস্টের একটি অট্টালিকায়। সেখানেই জোর করে তাদের পর্ন ছবিতে নামতে বাধ্য করা হতো বলে অভিযোগ।
টেট সমাজমাধ্যমে নিজের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ছবি এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন নিয়মিত। চুরুট হাতে বিলাসবহুল গাড়িতে চেপে ছবিও দিতেন তিনি। সমাজমাধ্যমে টেট এক সময় দাবি করেন, ফেরারি বুগাত্তি-সহ তার ৩৩টি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। ইতিমধ্যেই তার ১০টির বেশি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।
প্রভাবী হওয়ার আগে পেশাদার কিকবক্সার ছিলেন অ্যান্ড্রু। ২০০৫ সালে ‘কিং কোবরা’ নামে ওই খেলায় বেশ নাম করেন তিনি। লাইট হেভিওয়েট বিভাগে টেট দুইটি বিশ্ব খেতাবও জিতেছেন। পড়ে এমএমএ-তেও নামের তিনি। গ্রেফতার হওয়ার আগেও রোমানিয়ার একটি এমএমএ সংস্থার হয়ে ধারাভাষ্য দিতেন তিনি।
কিন্তু ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত রিংয়ের বাইরে তার পরিচিতি বিশেষ ছিল না। ব্রিটেনেও ‘বিগ বস’-এর মতো একটি রিয়ালিটি শো হয়। সেই শো-তে অংশ নেন টেট। কিন্তু সেখানে সমকাম বিরোধী এবং বর্ণবৈষম্যমূলক কথা বলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এক নারীকে বেল্ট দিয়ে আঘাত করার ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। তার পরই অনুষ্ঠান থেকে ছেঁটে ফেলা হয় তাকে।
অনুষ্ঠান থেকে বাদ পড়লেও নিজের ঐ আচরণকে মূলধন করেই নেটমাধ্যমে আত্মপ্রচার শুরু করেন টেট। বাড়তে থাকে অনুরাগীর সংখ্যা। ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে তার ৪৭ লক্ষেরও বেশি অনুরাগী তৈরি হয়। খেলার সূত্রেই টেট নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন। নিজের সুঠাম শরীর নিয়েও গর্বের শেষ ছিল না টেটের। খালি গায়ে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক কিংবা টুইটারে ছবি দিতেন তিনি। সেই ছবিতে হাজারে হাজারে লাইক পড়ত।
শুধু ধনসম্পদ কিংবা শরীর নয়, নিজেকে পুরুষতান্ত্রিকতার গুরু হিসাবে নেটমাধ্যমে প্রচার করা শুরু করেন টেট। বিভিন্ন নারীবিদ্বেষী ভিডিও প্রচার করতে শুরু করেন তিনি। নিজেকে প্রকাশ্যেই নারীবিদ্বেষী বলেও ঘোষণা করেন টেট। নিজের এই মতবাদ যাতে আরো ছড়িয়ে পড়ে তাই কীভাবে ‘দাদাগিরি’ করতে হবে তার পাঠ দিতে শুরু করেন নেটমাধ্যমে।
শেষ পর্যন্ত ফেসবুক, টুইটার এবং ইনস্টাগ্রামে তার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। নেটমাধ্যমে প্রচার বন্ধ হলেও নিজের ওয়েবসাইটে কর্মকাণ্ড জারি রাখেন তিনি। অভিযোগ, সেখানে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে ভক্তদের নারীবিদ্বেষী বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখাতেন তিনি।
রোমানিয়া প্রশাসনের দাবি, দাদার থেকে কোনো অংশে কম যান না ভাই ত্রিসতানও। ইনস্টাগ্রামে তারও অনুরাগীর সংখ্যা ২৩ লাখের কাছাকাছি। ভাইয়ের মতো তিনিও কিকবক্সিং করতেন। কিন্তু খুব একটা সফল হননি। পরে ভাইয়ের ব্যবসায় হাত লাগান। ত্রিসতানও ভাইয়ের মতোই নিজের বিলাসবহুল জীবনের প্রচার করতেন নেটমাধ্যমে।
নিজেদের সাইটকে বিশ্ববিদ্যালয় বলেও ঘোষণা করেন দুই ভাই। গুরু সেজে নিজের মতবাদ প্রচার করা শুরু করেন। কখনো নারীদের কুকুরদের সঙ্গে তুলনা করেছেন টেট, কখনো আবার বলেছেন, ধর্ষণের জন্য নারীরাই দায়ী।
নারীরা পুরুষদের কেনা পণ্যের মতো, টেট কার্যত এমন কথাই প্রচার করতেন বলে অভিযোগ। প্রশাসনের অভিযোগ, যে নারীদের আটকে রেখেছিলেন টেট এবং তার সঙ্গীরা, তাদের যৌনদাসীর মতো ব্যবহার করা হত। এমনকি, বন্দি নারীর শরীরে ‘টেটের গোলাম’ বলে ট্যাটুও করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
ইলন মাস্ক টুইটারের ক্ষমতা দখল করার পর নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট ফিরে পান বহিষ্কৃত বহু বিতর্কিত ব্যক্তিই। এই তালিকায় ছিলেন টেটও। টুইটারে ফেরার পর ফের শুরু হয় কটূক্তি করা। হুঙ্কার দেন, প্রশাসনকে ভয় পান না তিনি।
২৭ ডিসেম্বর অ্যান্ড্রু টেট পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের উদ্দেশে কটাক্ষ করে একটি টুইট করেন। তার কড়া জবাব দেন গ্রেটা। গ্রেটার সেই টুইট ভাইরাল হয়ে যায়। টেটকে যোগ্য জবাব দিয়েছেন বলে অনেকেই তারিফ করেন গ্রেটার।
ঘটনাচক্রে তার পরই টেটের বিরুদ্ধে নড়েচড়ে বসে রোমানিয়া প্রশাসন। এক নারী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, টেট দিনের পর দিন তাকে আটকে রেখে যৌন হেনস্থা করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই অ্যান্ড্রু টেট, ত্রিসতান টেট-সহ মোট ৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গ্রেফতারের পর টেট পুলিশ ও প্রশাসনকেও গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ। প্রাথমিক তদন্তের পর আরো ৬ জন নারী একই ধরনের অভিযোগ জানান, টেটের বিরুদ্ধে। ধর্ষণ ও নারীপাচারের মামলাও দায়ের হয় টেট ভাইদের বিরুদ্ধে। আপাতত অভিযুক্তদের ৩০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
সূত্র: আনন্দবাজার