নাখোদা মসজিদ: একই সুতোয় বাধা ধর্ম ও সংস্কৃতি-জীবন, জেনেনিন এর ইতিহাস?

আশ্চর্য শহর কলকাতা। নাখোদা সংলগ্ন রাস্তা, মহল্লা মনে করিয়ে দেয়, সাবেক কলকাতায় গড়ে ওঠা পেশাভিত্তিক পল্লিগুলোর অন্যতম ছিল কলুটোলা। ঘানি ঘুরিয়ে তেল পেষা আর বিক্রির কাজ করতেন নিম্নবিত্ত শ্রমিকরা। ক্রমে এ পাড়ায় গড়ে ওঠে কলকাতার সম্ভ্রান্ত মানুষের বসতিও। মতিলাল শীল, সাগরলাল দত্ত, বদনচন্দ্র রায়দের ভদ্রাসনও এই পাড়ায়। কেশবচন্দ্র সেনের পরিবারকে বলা হত ‘কলুটোলার সেন’।
তবে এই জায়গার ধর্ম ও সংস্কৃতি-জীবনের মধ্যমণি হয়ে আছে একটি স্থাপনা। মোগল স্থাপত্য প্রভাবিত ‘নাখোদা মসজিদ’। এটি পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় মসজিদ।
গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চল থেকে মেমন গোষ্ঠীর বণিকরা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে নৌবাণিজ্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে এ শহরে আসেন কয়েক শতক আগে। ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধির ফলে নানা জনসেবামূলক কাজ শুরু করেন তাঁরা; মাদ্রাসা, মুসাফিরখানার পাশাপাশি চিৎপুরের এই মসজিদটি গড়ে তোলেন নতুন করে। ১৯২৬-এ শুরু, কাজ শেষ হয় ১৯৩৪ সালে। ফার্সিতে ‘নাখুদা’ শব্দের অর্থে নাবিক। সেই থেকেই নাম নাখোদা মসজিদ। পনেরো লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল, আবদুর রহিম ওসমান দান করেছিলেন সর্বাধিক অর্থ। প্রতিষ্ঠানের প্রথম মুত্তাওয়ালি বা কেয়ারটেকার হাজি নূর মহম্মদ জাকারিয়ার নামেই রাখা হয় মসজিদের সামনের রাস্তার নাম।
শহরের আরও বহু ঐতিহ্যশালী স্থাপত্যের মতোই, ম্যাকিনটশ বার্ন সংস্থা তৈরি করে এই মসজিদ। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের দু’টি মূল মিনারের উচ্চতা দেড়শো ফুটের বেশি। রমজান মাসে উপবাসের সময় নির্দেশ করতে মিনারের উপরে জ্বলে সবুজ আর লাল বাতি। আছে ২৫টি ছোট মিনার। মসজিদের মূল ফটক মনে করায় বাদশা আকবরের স্মৃতিবিজড়িত ফতেপুর সিক্রির ‘বুলন্দ দরওয়াজা’-র কথা। লাল বেলেপাথর আর সাদা মার্বেলের তৈরি মসজিদে সমবেত হতে পারেন কয়েক হাজার মানুষ। নমাজ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় ছাড়া, কিছু নিয়ম মেনে ঢুকে দেখতে পারেন অন্য ধর্মাবলম্বীরাও।
এই পাড়াতেই পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ি এসেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, হরিভক্তি প্রদায়িনী সভায় অংশ নিতে। এখান থেকেই যেমন ‘কুন্তলবৃষ্য’ তেলের আবিষ্কার করেন কবিরাজ বিনোদলাল সেন, তেমনই বক্স ইলাহীর হাত ধরেই শুরু হয় ভারতে উইলস সিগারেটের যাত্রা। আবার সব সময় যে এ অঞ্চলে শান্তি বজায় থেকেছে, তাও নয়। স্বাধীনতা-পূর্ব দাঙ্গা অশান্তির আঁচও লেগেছিল কলুটোলার গায়ে। তবু সব মিলিয়েই কলকাতার মিশ্র সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়ক নাখোদা মসজিদ আর কলুটোলা।