বিশেষ: চরম শত্রু হয়েও ইরানের রাজতন্ত্রবাদীরা কেন ইসরায়েলের পক্ষে?

ইরান-ইসরায়েল। একে অপরের প্রতি চরম বৈরী দুই দেশ। সম্প্রতি ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরায়েল বৈরিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, হামাসের প্রধান সহায়তাকারী হচ্ছে ইরান।
তবে ইসরায়েল যখন হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যুদ্ধ শুরু করছে, তখন অনেকের মধ্যেই এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এই যুদ্ধ হয়তো শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এদিকে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন কিছু চিত্র। ইরানের শত্রু হয়েও একটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিস্ময়করভাবে সমর্থন পাচ্ছে ইসরায়েল। তারা হচ্ছে দেশটির রাজতন্ত্রবাদী রেজা পাহলাভির অনুসারী।

গাজা সংঘাতে ইসরায়েলের পক্ষ নেয়া এই গোষ্ঠী ইরানের শেষ শাহ (রাজা) মোহাম্মদ রেজা পাহলাভির ছেলে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন মোহাম্মদ রেজা পাহলাভি।

ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন সমাবেশে ইরানের পুরোনো পতাকা হাতে দেখা গেছে এই রাজন্ত্রবাদীদের। ইসরায়েল ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশংসাও করেছেন তারা। এ থেকে মূলধারার ইরানি ও তাদের মতবিশ্বাসের ফারাকটা উঠে এসেছে। ইরানিরা ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে আসছেন।

ইসরায়েলের প্রতি ইরানের রাজতন্ত্রবাদীদের এই পক্ষপাতের কারণে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দেশটির সরকারবিরোধীদের মধ্যে তাদের অবস্থান কতটা শক্তিশালী, তা নিয়েও প্রশ্ন করছেন অনেকে।

বন্ধুত্ব থেকে বৈরিতা

ইরানের সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখলেও ইরানের ভেতরে আগে থেকেই ইসরায়েল বিরোধিতা ছিল। ইরানের শাহ শাসন বিরোধী বামপন্থীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলন ফাতাহ এবং এর নেতা ইয়াসির আরাফাতের যোগাযোগ ছিলো। অন্যদিকে, আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং তার অনুসারীরাও ছিলেন ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। তবে ইরান-ইসরায়েল সম্পর্ক ভেঙ্গে পড়ে মূলত ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর। তখন ক্ষমতায় আসা ইরানের বিপ্লবী সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নেয়ার ঘোষণা দেয় এবং তেহরানে ইসরায়েলের দূতাবাসকে ফিলিস্তিনি দূতাবাসে পরিণত করে। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মূলত ইরানের বিপ্লবী সরকার ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স এর শিক্ষক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্বাস ফয়েজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ইরানি সরকারের ইসরায়েল নীতি পরিবর্তন হওয়ার কারণেই দুই দেশের সম্পর্ক বৈরি হতে শুরু করে।

তিনি বলেন, ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সরকার আমেরিকা এবং ইসরায়েলকে তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনকে সমর্থন দেয়ার নীতিও নিয়েছিল।

ইরানে বিরোধীদের মধ্যে বিভক্তি

ইরান সরকারের বিরোধীদের মধ্যে বিভিন্ন ভাগ রয়েছে। বিরোধী পক্ষে রাজতন্ত্রবাদীদের মতো রয়েছেন প্রজাতন্ত্রের পক্ষের ব্যক্তিরাও। এই আদর্শগত ভিন্নতা তাদের একতায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই কারণে সংঘাতময় তিক্ত সম্পর্কেও জড়িয়েছেন তারা। ফলে দেখা দিয়েছে বিভক্তি।

গত ডিসেম্বরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান কারাবন্দি ইরানি নারী অধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মাদি। ডিসেম্বরে নার্গিসের পক্ষে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন তার স্বামী ও দুই সন্তান। এ সময় সুইডেনের রাজা ও রানির সঙ্গেও দেখা করেছিলেন তারা।

সে সময় নার্গিস ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন ইরানের রাজতন্ত্রবাদীদের অনেকে। নার্গিসের এই গ্রহণযোগ্যতা মেনে নিতে পারেননি তারা। তাদের ভাষ্য ছিল, নার্গিস মোহাম্মাদি ইরানিদের প্রতিনিধি নন। এ কথাও বলেন যে রাজা রেজা পাহলাভি আমাদের আসল প্রতিনিধি।

ডিসেম্বরে এই প্রচার-প্রচারণায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। রেজা পাহলাভির স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলাভি ইনস্টাগ্রামে প্রশ্ন তোলেন, কারাগারে থেকেও নার্গিস কীভাবে মার্কিন অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি আসলে রাজনৈতিক বন্দী নন, বরং ইরান সরকারের হাতের পুতুল।

নার্গিস মোহাম্মাদির মতো ইরানের গণতন্ত্রপন্থীদের নিয়ে রাজতন্ত্রবাদীদের এই বিরোধিতার মূলে রয়েছে তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক বৈপরীত্য। রাজতন্ত্রবাদীরা মনে করেন, রেজা পাহলাভি ইরানের যুবরাজ এবং প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা। তার নেতৃত্বে ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ হবে। নিষেধাজ্ঞাসহ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নানা কঠোর পদক্ষেপেরও সমর্থন করেন তারা।

সেদিক দিয়ে নার্গিস মোহাম্মাদির চিন্তাভাবনা ভিন্ন। তিনি ইরানের সংস্কারবাদী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। বিগত নির্বাচনগুলোয় হাসান রুহানি ও মির হোসেইন মাউসাভির মতো মধ্যপন্থী ও সংস্কারবাদী প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন। ইরানের অর্থনীতিকে আঘাত করে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞার পক্ষেও তিনি নন।

রেজা পাহলাভির স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলাভি ইনস্টাগ্রামে যেভাবে নার্গিসকে আক্রমণ করেছিলেন, তা কিন্তু নতুন নয়। এর আগেও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজনের প্রতি বৈরী মনোভাব প্রকাশ করেছেন তিনি। গত নভেম্বরে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী একটি সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এ সময় তার হাতে ছিল ইসরায়েলের পতাকা।

গাজায় চলমান সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইরানের রাজতন্ত্রবাদীরা ইসরায়েলের প্রতি কড়া সমর্থন জানিয়েছেন। ইসরায়েলের পক্ষে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে সমাবেশ করেছেন তারা। অনলাইনেও প্রচারণা চালাচ্ছেন। ওয়াশিংটনে পাহলাভিপন্থী সংগঠন ন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেসি ইন ইরান (এনইউএফডিআই) তো ফিলিস্তিনপন্থীদের ‘ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সমর্থক’ তকমা দিয়েছে।

জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন

ইরানের জনমানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, তার সঙ্গে খুব কম মিল রয়েছে দেশটির রাজতন্ত্রবাদীদের। তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থী। ফিলিস্তিনে নৃশংসতার সঙ্গে যুক্ত ইসরায়েল। আর ইরানের বর্তমান সরকারের উৎখাত চায় ওয়াশিংটন। এ কারণেই সরকারবিরোধীদের মধ্যে একঘরে হয়ে পড়েছেন রাজতন্ত্রবাদীরা।

যেমন গত নভেম্বরে ইরানের নয়জন রাজনৈতিক বন্দি কারাগার থেকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাতে ‘গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের’ নিন্দা জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

ওই ৯ বন্দির মধ্যে ছিলেন ইরানের নারী অধিকারকর্মী আনিশা আসাদোল্লাহি, মানবাধিকারকর্মী ও লেখক গুলরুখ ইরায়ি, শ্রমিক অধিকারকর্মী রেজা শাহাবি ও সাংবাদিক আরাশ জোহারি। রাজতন্ত্রবাদীদের প্রতি ইঙ্গিত করে চিঠিতে তারা বলেন, পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর হামলায় সামাজিক অবকাঠামো ধ্বংসের পর মূলত সেখান থেকে সুবিধা নিতে চাইছে এই লোকগুলো। দেখে মনে হয় গত দুই দশকে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ থেকে তারা কিছুই শেখেনি।

রেজা খান্দান নামের ইরানের আরেক অধিকারকর্মী বলেছেন, রাজতন্ত্রবাদীরা ‘সুযোগসন্ধানী’ এবং ‘ইরানের জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন’। এদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য বিশ্বব্যাপী যে আহ্বান উঠেছে, তাতে সমর্থন জানিয়েছেন নার্গিস মোহাম্মাদি। আর তার স্বামীসহ ৬০ জনের বেশি গণতন্ত্রপন্থী একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাতে গাজা সংকটকে অজুহাত হিসেবে কাজে লাগিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর যে প্রচেষ্টা চলছে, তার নিন্দা জানানো হয়েছে।

শত্রুর শত্রু যখন বন্ধু নয়

রেজা পাহলাভির কর্মকাণ্ড ইরানের জনগণের বড় বিরোধিতার মুখে পড়েছে। মাসা আমিনির মৃত্যুর পর আন্দোলনেও তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। যেমন আন্দোলনের সময় অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, শাহ কিংবা নেতা (আয়াতুল্লা আলী খামেনি) যে-ই হোক না কেন, জুলুমবাজের মৃত্যু চাই।

ইরানের অনেক অধিকারকর্মী ও সরকারের সমালোচকও রাজতন্ত্রবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থন রাজতন্ত্রবাদীদের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার অভাবকেই তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে তারা যে ইরানিদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান করেন না, তা পরিষ্কার হয়েছে।

নার্গিস মোহাম্মাদিকে নিয়ে ইনস্টাগ্রামে ইয়াসমিন পাহলাভি যে পোস্ট করেছিলেন, তার সমালোচনা করে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সাদেগ জিবাকালাম বলেন, নার্গিসের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার’ কারণেই তাকে সহ্য করতে পারেন না রাজতন্ত্রবাদীরা।

সরকারের সমালোচনার কারণে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল সাদেগ জিবাকালামকে। এ কারণে কারাগারেও ছিলেন তিনি। এই শিক্ষক বলেন, এটা আরো দুঃখজনক যে আজ ক্ষমতায় না থেকেও তারা (রাজতন্ত্রবাদী) অন্যদের সহ্য করতে পারছেন না। বিরোধীদের গ্রহণ করতে পারছেন না। তারাই যদি আগামীকাল ক্ষমতায় আসেন, তাহলে তারা কীভাবে নিজেদের আইনের শাসন, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাবি করবেন?

সন্দেহজনক গতিবিধি

শাহ মোহাম্মাদ রেজা পাহলাভি ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ইরান শাসন করেছেন। জ্বালানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের সমর্থনেও সোচ্চার ছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় মোহাম্মাদ রেজা পাহলাভি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেন।

অন্যদিকে তার সন্তান রেজা পাহলাভি ও তার অনুসারীরা সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের দিকে আরো ঝুঁকেছেন। ইসরায়েলকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখেন। নিজেদের এই অবস্থান দেশের ভেতরে এবং আঞ্চলিকভাবে কী প্রভাব ফেলছে, তাও মাথায় নেন না।

রাজতন্ত্রবাদীদের ইসরায়েলপন্থী অবস্থান আরো জোরদার হয়েছে গত বছরের এপ্রিলে রেজা পাহলাভি ও তার স্ত্রীর ইসরায়েল সফরের পর। দেশটিতে দুজনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। ওই সফরে রেজা পাহলাভি মুসলমানদের পবিত্র মসজিদ আল-আকসার বদলে ‘ওয়েস্টার্ন ওয়ালে’ (ইহুদিদের প্রার্থনাস্থল) গিয়ে প্রার্থনা করেছিলেন।

আর ইয়াসমিন পাহলাভি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের একজন নারী সেনার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা।’ ইরানে পুলিশি হেফাজতে তরুণী মাসা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে আন্দোলনে এই স্লোগান প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। ইয়াসমিন পাহলাভি ইসরায়েলকে নিয়ে একই স্লোগান ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মাসা আমিনির মৃত্যুর পর রাজপথে নামা বিক্ষোভকারীরা।

ইসরায়েল সফরে রেজা পাহলাভি সঙ্গে নিয়েছিলেন তাঁর উপদেষ্টা আমির এতেমাদি ও ইসরায়েলপন্থী গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের (এফডিডি) কর্মকর্তা সাইদ গাসেমিনেজাদকে। ফিলিস্তিনবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুজনই বিতর্কিত। এমনকি ‘ফিলিস্তিনের ধ্বংস’ চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টও করেছিলেন তারা।