বিশেষ: ইতিহাসের পাতায় ভয়াবহ সব বন্যা, যার ক্ষয়-ক্ষতি আজও ভোলার নয়

ইতিহাসে বারবার ভয়াবহ সব বন্যার সাক্ষী হয়েছে পৃথিবীর একাধিক দেশ। ইতিহাসের তেমন কিছু ভয়াবহ বন্যা নিয়ে আজকের লেখা।

চীনে বন্যা:

ইতিহাসে কয়েকটি ভয়াবহ বন্যা হয়েছে চীনে। অবিরাম বৃষ্টি ও তুষারপাতের কারণে ১৯৩১ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইয়াংজি ও হুয়াই নদীর জল উপচে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়। এতে ১০ লাখ এমনকি অনেকের মতে ৪০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৩৮ সালে চীনেরই ইয়েলো রিভারের বন্যায় প্রায় আট লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

জোনসটাউন বন্যা:

১৯৮৯ সালের ৩১ মে, দিনের শুরুটা ছিল অন্য দশটা সাধারণ দিনের মতোই। কিন্তু মাসের শেষ বিকালটা যে এমন হবে, তা ভাবতে পারেনি কেউ। কারো ধারণাতেও ছিল না পেনসিলভানিয়ার লেক কনেমাঘের বাঁধ ভেঙে শহরের দিকে ধেয়ে আসছে ৪০ ফুট উঁচু এক জলোচ্ছ্বাস। এতে এক ঘণ্টার মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যায় সম্পূর্ণ জোনসটাউন। এই ভয়াবহ বন্যায় প্রাণ হারায় কমপক্ষে দুই হাজার মানুষ, ধ্বংস হয়ে যায় এক হাজার ৬০০ ঘরবাড়ি। দুর্বল বাঁধ নির্মাণের কারণেই এমনটা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

গ্রোট মেনড্রেক:

১৩৬২ সালের গ্রোট মেনড্রেক নামক বন্যা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ইউরোপে। এ বন্যা প্রথম আঘাত করে ইংল্যান্ডে, যদিও এর ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি ছিল নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক আর জার্মানিতে। প্রায় লাখ মানুষ এ বন্যায় ডুবে যায়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ বন্যা ইউরোপের উপকূলীয় অঞ্চলকে নতুন রূপ দিয়েছিল।

সিন্ধু উপত্যকার বন্যা:

১৮৪১ সালের প্রথম দিকে বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু উপত্যকায় এক ভয়াবহ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যার ফলে নাগা পর্বতে সৃষ্ট পাহাড়ধসে সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিক এক লেকের। কিন্তু প্রকৃতির ক্রমাগত বদলে সেই বছরের জুনেই সে লেকের বাঁধ ভেঙে ধেয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস, যার ঢেউ ছিল প্রায় ১০০ ফুট উঁচু। এতে ধ্বংস হয়ে যায় সেখানকার কয়েকশ গ্রাম। মারা যায় সেখানে অবস্থানরত প্রায় ৫০০ শিখ সেনা।

আরকানসাসের বন্যা:

১৯২৭ সালে মিসিসিপি নদীর বাঁধ ভেঙে যে বন্যার সৃষ্টি হয়, তা ছিল আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মিসিসিপি, আরকানসাসের লুইজিয়ানা। মারা যায় প্রায় ২৫০ মানুষ এবং ঘরছাড়া হয় প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যা তখনকার মার্কিন নাগরিকদের ১ শতাংশ।

ইতালির মহাপ্লাবন:

ক্রমাগত বৃষ্টির ফলে আরনো নদীতে যে মহাপ্লাবন আসে, তা ইতালির জন্য ছিল ভয়াবহ। প্লাবনের সঙ্গে ফ্লোরেন্সের রাস্তা ঢেকে যায় প্রায় ১৮ মিলিয়ন গ্যালন কাদায়। এই প্লাবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইতালির রেনেসাঁ যুগের কিছু শিল্পকর্ম। ইতালিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আর্ট গ্যালারি আর লাইব্রেরিগুলোও ধ্বংসের মুখে পড়ে। নষ্ট হয়ে যায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ বই।

ব্রিটেনের মহাপ্লাবন:

১৬০৭ সালের মহাপ্লাবন কেন হয়েছিল, তা এখনো সঠিকভাবে বলতে পারেন না ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞরা। বছরের শুরুতেই হঠাৎ সাগরের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় ২০০ বর্গমাইল উপকূলীয় এলাকা। ভেসে যায় ২০টি গ্রাম। ধারণা করা হয়, সাগরে সৃষ্ট সুনামির কারণে এই ভয়াবহতা। এতে মারা যায় অন্তত দুই হাজার মানুষ। সামারসেট অঞ্চলে প্রায় ১৫ মাইল এলাকা সাগরে তলিয়ে যায় এবং প্লাসটনবারি পাহাড় দ্বীপে পরিণত হয়।

ভারতের জম্মু-কাশ্মীর বন্যা: ২০১৪

জনবহুল ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে ২০১৪ সালে ভয়াবহ এক বন্যা দেখা দেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৮০টি গ্রাম। এ বন্যাকে বলা হয় ভারত-পাকিস্তান বন্যা। বৃষ্টিসৃষ্ট বন্যাটির কারণে হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়। গৃহহীন হয় হাজার হাজার মানুষ।

বাংলাদেশে বন্যা

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয় ১৯৭৪ সালে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্যার কারণে সরকারি হিসেবে ২৮ হাজার ৭০০ জন মারা যায়। তবে বেসরকারি হিসেবে কলেরা, ডায়রিয়াসহ নানা রোগ ও দুর্ভিক্ষে এ সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ছাড়িয়েছিল।

Related Posts

© 2024 Tech Informetix - WordPress Theme by WPEnjoy