ফেসবুক কীভাবে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে জানেন?-জেনেনিয়ে আজই হয়ে যান সতর্ক

আমরা ঘুম থেকে উঠে যে অ্যাপটি প্রথম খুলি, সেটিই হয়ে উঠতে পারে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ‘ডিজিটাল শত্রু’। ফেসবুক এখন শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটি এক শক্তিশালী মনোবৈজ্ঞানিক ও তথ্য বিশ্লেষণকারী যন্ত্র, যা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে এবং আমাদের রিয়েল-টাইম আচরণের ভিত্তিতে অজান্তেই আমাদেরকে ‘ম্যানিপুলেট’ করছে।

আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই বা সার্চ করার পর আপনার নিউজফিড সেই সম্পর্কিত পোস্ট ও কনটেন্টে ভরে যাচ্ছে। আপনি পোস্ট দেখে তাতে ঢুকে গেলেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, কীভাবে ফেসবুক আপনার কথা জানতে পারল এবং কীভাবে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?


 

ফেসবুক কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে?

 

ফেসবুক আমাদের ফোন থেকে অবিশ্বাস্য পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় নিচে দেওয়া হলো:

  • লোকেশন ডেটা: আপনার ভৌগোলিক অবস্থান ট্র্যাক করা হয়।
  • মাইক্রোফোন অ্যাক্সেস: আপনি কথা বললেই কিছুক্ষণ পর সেই সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন দেখতে পান—এটা মাইক্রোফোন অ্যাক্সেসের কারণেই ঘটে।
  • আই ট্র্যাকিং: আপনার স্ক্রিনে কোথায় কতক্ষণ চোখ রেখেছেন, সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে আপনার আগ্রহের ক্ষেত্র বোঝা হয়।
  • যোগাযোগের ধরন: আপনি কাদের সঙ্গে কথা বলেন, কী টাইপ করেন, এমনকি কী লেখার পর আবার মুছে ফেলেন – এই সবকিছুই সংগ্রহ করা হয়।
  • অন্যান্য অ্যাপের ব্যবহার: যদি অনুমতি দেওয়া থাকে, তাহলে আপনার ফোনের অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহারের প্যাটার্নও ফেসবুক সংগ্রহ করে।
  • ফটো ও ভিডিও ডেটা: আপনি যেসব ছবি ও ভিডিও পাঠান, সেগুলোর সময়, স্থান, এবং ডিভাইসের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।
  • ওয়েবসাইট ভিজিট: আপনি যেসব ওয়েবসাইট ভিজিট করেন, ফেসবুক পিক্সেলের মাধ্যমে সেগুলোর তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।

এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ফেসবুক জানতে পারে, আপনি কখন কষ্টে আছেন, কখন অবসাদগ্রস্ত, কবে আপনার জন্মদিন, কখন আপনি ছুটির মেজাজে আছেন এবং এমনকি আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ কী।


 

ফেসবুক কীভাবে শক্তিশালী অ্যালগরিদম ব্যবহার করে?

 

ফেসবুকের নিয়ন্ত্রণের মূল অস্ত্র হলো এর অদৃশ্য, অথচ অসাধারণভাবে দক্ষ অ্যালগরিদম। এটি কেবল কম্পিউটার কোড নয়, বরং এক ধরনের ‘ডিজিটাল ব্রেন’ যা প্রতিনিয়ত আমাদের আচরণ, চিন্তা ও অনুভূতির গভীর বিশ্লেষণ করে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, আবেগ-অবসাদ, বিশ্বাস ও মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে আমাদের সামনে কনটেন্ট সাজিয়ে দেয়।

এই অ্যালগরিদমগুলো যেভাবে কাজ করে:

১. এনগেজমেন্ট বেজড ফিল্টারিং: আপনি কোন পোস্টে লাইক দেন, কোন ভিডিওতে বেশি সময় ব্যয় করেন, কার পোস্টে কমেন্ট করেন—এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম বুঝে নেয় আপনি কী দেখতে ভালোবাসেন। এরপর সেই ধরনের কনটেন্টই নিয়মিত আপনার ফিডে ঠেলে দেয়, যাতে আপনি আরও বেশি সময় অ্যাপে থাকেন।

২. মেশিন লার্নিং: ফেসবুক প্রতিদিন তাদের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে শেখে। এই ‘মেশিন লার্নিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফেসবুকের অ্যালগরিদম নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে শেখে কাকে কী দেখালে সে খুশি হবে, ক্লিক করবে, শেয়ার করবে কিংবা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

৩. ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিশ্লেষণ: ফেসবুক শুধু আপনি কী দেখছেন তা নয়, ভবিষ্যতে আপনি কিসে আগ্রহী হবেন, সেটিও পূর্বাভাস দিতে পারে। আপনি হয়তো এখনও কিছু সার্চ করেননি, কিন্তু আপনার আগের ব্যবহার দেখে ফেসবুক আপনাকে সেই কনটেন্ট আগেই দেখিয়ে দেয়, যেন আপনি ভাবেন, ‘বাহ! এটাই তো আমি খুঁজছিলাম!’

৪. অনুভূতি শনাক্তকরণ: আপনার লেখার ভাষা, পোস্টের ইমোজি, কমেন্টের টোন বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম বুঝে নেয় আপনি খুশি, কষ্টে, বিরক্ত না রাগান্বিত। এরপর সে অনুযায়ী আবেগ-নির্ভর কনটেন্ট সামনে আনে, যা আপনার প্রতিক্রিয়া বা এনগেজমেন্ট বাড়িয়ে তোলে।

৫. সামাজিক গ্রাফ বিশ্লেষণ: আপনার বন্ধুদের পছন্দ, তারা কী দেখছে বা শেয়ার করছে—সেই তথ্য ব্যবহার করে আপনাকেও একই ধরনের কনটেন্টে সংযুক্ত করে। এতে আপনি ভাবেন, ‘আমার বন্ধু দেখছে, মানে আমিও দেখবো।’ ফলে আপনি নিজেই অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়েন।


 

বাংলাদেশে এর ভয়াবহ প্রভাব

 

বাংলাদেশে প্রযুক্তি সচেতনতার অভাবে মানুষ বুঝতেই পারে না যে তারা কীভাবে ম্যানিপুলেট হচ্ছে। এখানকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। মব সৃষ্টি হচ্ছে এখন সোশ্যাল মিডিয়াতেই। কাউকে ট্রোল করা, হেয় করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক। সেই ব্যক্তির কার্যকলাপ বা আসল ঘটনা জানার আগেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নেতিবাচক খবর। এছাড়া:

  • রাজনৈতিক মিথ্যাচার: একপক্ষীয় কনটেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে পড়েছে।
  • ধর্মীয় উসকানি: বেছে বেছে হিংসাত্মক পোস্ট দেখানো হচ্ছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিশানা করে।
  • কিশোরদের মানসিক অবনতি: গ্ল্যামারাইজড কনটেন্ট দেখিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা ও আত্মসমালোচনার প্রবণতা বাড়াচ্ছে।
  • ভুয়া খবর ও গুজব: প্রচুর ভুয়া লিংক ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কারণ AI (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) বুঝে যায় আপনি এই ধরনের কনটেন্টে ক্লিক করছেন।

 

কীভাবে এড়ানো যায় এই ক্ষতি?

 

এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে বাঁচতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

  • অপ্রয়োজনীয় পারমিশন বন্ধ করুন: ফেসবুক অ্যাপে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় পারমিশন বন্ধ করুন। যেমন – লোকেশন, মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, ফোন লিস্ট – সব পারমিশন রিভিউ করুন।
  • নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন: যতটুকু সম্ভব নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। ফেসবুক নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ককে ট্রিগার করে।
  • নিয়মিত ডিজিটাল ডিটক্স করুন: দিনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অ্যাপ ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • ভিন্ন মতাদর্শের কনটেন্ট দেখুন: একপক্ষীয় তথ্য দেখলে নিজেই সার্চ করে যাচাই করুন।
  • প্রাইভেসি সেটিংস আপডেট রাখুন: ফেসবুকের প্রতিটি প্রাইভেসি সেটিং বুঝে বুঝে কাস্টমাইজ করুন।
  • সচেতন হোন ও সচেতন করুন: পরিবার-বন্ধুবান্ধবকে সচেতন করুন। সচেতনতাই সাইবার নিরাপত্তার প্রথম ধাপ।

ফেসবুক আমাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাবও ফেলেছে, তবে এর ‘অন্ধকার দিকটা’ অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে এই বিষয় নিয়ে গবেষণা, সাংবাদিকতা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। নয়তো আমরা একটি লক্ষহীন ডিজিটাল দাসত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমরা নিজেরাই জানি না কে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে।