গাড়ি নির্মাণে চীনের উত্থান: জেনেনিন কিভাবে হলো রাজত্বের শুরু?

অটোমোটিভ খাত অর্থাৎ গাড়ি নির্মাণ, নকশা ও ইভি তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি হয়ে উঠছে চীন।

এ অভাবনীয় সাফল্য অব্যাহত থাকলে শিগগিরই এ খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাজত্ব কেড়ে নিতে পারে দেশটি।

কিংবদন্তী গাড়ি নকশাবিদদের নিয়োগ

সম্প্রতি বিশ্বের সেরা সব অটোমটিভ গাড়ি নকশাকারীকে নিয়োগ দিতে দেখা গেছে বিভিন্ন চীনা কোম্পানিকে।

এর মধ্যে রয়েছেন উলফগ্যাং এগার, যিনি এর আগে আলফা রোমিও, আউডি ও ল্যাম্বরগিনির মতো জনপ্রিয় বিলাসবহুল গাড়ি নকশা করেছেন। বর্তমানে তিনি চীনা ইভি নির্মাতা ‘বিওয়াইডি’র মূল নকশাবিদ হিসেবে কাজ করছেন।

নিজের পুরো পেশাগত জীবনে ‘রোলস রয়েস’-এ কাজ করেছেন অটোমোবাইল ডিজাইনার জাইলস টেইলর। এ ছাড়া, ব্র্যান্ডটির রাজকীয় ‘ফ্যান্টম’ মডেলের নকশাও তার করা। সম্প্রতি তিনি চীনা অটোমোবাইল কোম্পানি ‘ফ’তে মোটা বেতনে চাকরি পেয়েছেন, যেখানে রোলস রয়েসের মতো করেই কোম্পানিটির বিলাসবহুল ‘হং কি’ মডেল নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

এ ছাড়া, সুইডিশ গাড়ি নির্মাতা ভলভো’র সাফল্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অটোমোবাইল ডিজাইনার পিটার হরবুরি নিয়োগ পেয়েছিলেন চীনা অটোমটিভ কোম্পানি গিলি’তে। এর পর থেকেই চীনা এই কোম্পানিটির বিভিন্ন গাড়ি নিয়ে কাজ আসছেন তিনি, যেখানে তার সর্বশেষ জনপ্রিয় উদ্ভাবন হচ্ছে ‘জিকার ০০১’ মডেলের গাড়িটি। এই একই কোম্পানিতে নিয়োগ পেয়েছেন লাক্সারি ব্র্যান্ড ‘বেন্টলি’র সাবেক প্রধান নকশাবিদ স্টেফান শেলাফ।

অন্যদিকে, ক্লস জাইকইরা বিশফ, যার হাত ধরে ইউরোপীয় অনেক জনপ্রিয় গাড়িই জন্ম নিয়েছে, তিনি এখন কাজ করছেন চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত অটোমোবাইল কোম্পানি ‘চ্যাংগান’-এ, যেখানে কোম্পানির ‘অ্যাভাটার’ ও ‘ডিপাল’ মডেলের গাড়ি বিকাশেও তার অবদান আছে।

বর্তমানে চীনে কাজ করছেন, এমন কিংবদন্তী অটোমেটিভ প্রকৌশলী ও মেকানিকদের তালিকা আরও দীর্ঘ। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, শিগগিরই চীন অটোমেটিভ জগতেও আধিপত্য বিস্তার করতে যাচ্ছে।

যৌথ উদ্যোগ

১৯৮৫ সালে মাত্র পাঁচ হাজার গাড়ি উৎপাদন করেছিল চীন, যখন দেশটির জনসংখ্যা মাত্রই একশ কোটি ছাড়িয়েছে। চার দশক পর দেশটি নিজেদের অতীতে ফিরে তাকালেই বুঝতে পারবে, তারা অটোমেটিভ উৎপাদন খাতে কতটা এগিয়েছে। দেশটির সরকারও এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় কারণ চীনের জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে এ খাত।

৮০’র দশকের মাঝামাঝিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অটোমেকারদের বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করেছিল চীন। এর মধ্যে রয়েছে:

● ‘আমেরিকান মোটর্স কর্পোরেশন (এএমসি), যারা বেইজিংইয়ে জিপ মডেলের গাড়ি বানাতে সর্বপ্রথম ১৯৮৩ সালে পাঁচ কোটি ১০ লাখ ডলারের এক যৌথ উদ্যোগের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।

● ১৯৮৪ সালে সাংহাই শহরে ‘স্যান্টানা সেডান’ মডেলের গাড়ি ও বিভিন্ন ইঞ্জিন নির্মাণের জন্য ২৫ বছরের এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল জার্মানভিত্তিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি ফোক্সভাগেন, যার মূল্য ছিল ছয় কোটি ৬০ লাখ ডলার।

● চীনের গুয়ানজু শহরে যাত্রীবাহী গাড়ি নির্মাণের আরেক প্রকল্পে কাজ করতে রাজি হয়েছিল ফ্রান্সের অটোমোবাইল ব্র্যান্ড পুজো।

চীনে ইভি’র উত্থান

এক সময় সৌখিন খাত হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন বাণিজ্যিক পরিসরেও ইভি’র উপস্থিতি বেড়েছে, বিশেষ করে চীনে।

ইভি খাতে চীনের উত্থান নিয়ে টেসলার সিইও ইলন মাস্ক বলেছিলেন, চীনা ইভি নির্মাতারা চীনের বাইরেও ‘বড়’ সাফল্য পাবে। আর সংখ্যাও একই কথা বলছে।

২০২৩ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অটোমেটিভ উৎপাদন খাত হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে চীন, যেখানে সর্বমোট গাড়ি নির্মাণ হয়েছে তিন কোটি। এ ছাড়া, নবায়নযোগ্য শক্তিভিত্তিক ইভি, যা ‘এনইভি’ নামেও পরিচিত, সেখানে প্রায় ৯০ লাখ গাড়ি উৎপাদন করে এ খাতেও বৈশ্বিকভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশটি। আর বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ‘এনইভি’র উৎপাদন হয় চীনে।

চীনা বাজারে ইভি খাতের আকাশচুম্বী উত্থানের পেছনে মূল উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে ‘মেইড ইন চায়না ২০২৫’ পরিকল্পনাটি, যেখানে দেশটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে অলাভজনক সাইট আইএমডি।