বিশেষ: বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন? জেনেনিন ৪টি আইডিয়া

ইলন মাস্ককে বলা হয় বাস্তব দুনিয়ার আয়রন ম্যান। কমিক বই বা সিনেমার পর্দার আয়রন ম্যান একজন জিনিয়াস, তিনি দারুন দারুন সব আইডিয়া বের করেন, এবং সেগুলো কাজে লাগিয়ে নিজে তো টাকার পাহাড় গড়েছেনই, সেইসাথে পৃথিবীর মানুষের উপকার করারও চেষ্টা করেন। ইলন মাস্ক অনেকটাই সেরকম। তিনি দিন রাত খেটে নতুন নতুন প্রযুক্তির আইডিয়া বের করেন। সেগুলো কাজে লাগিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। আবার সেই ডলার খরচ করেন পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করার প্রজেক্টে।
তবে ইলন মাস্ক শুধুমাত্র একজন টেকনিক্যাল জিনিয়াস নন। তিনি ব্যবসাটাও খুব ভালো বোঝেন। তা না হলে শুধু টেকনিক্যাল জিনিয়াস হলেই বিলিওনেয়ার হওয়া যায় না। পৃথিবীতে এমন বহু জিনিয়াস এসেছেন, যাঁরা দারুন দারুন আইডিয়া ভাবলেও, টাকা আয় করা তো দূরের কথা – আইডিয়া বাস্তবায়নও করতে পারেননি। তাই, বর্তমান বিশ্বের একজন সেরা প্রযুক্তিবিদ ও আবিষ্কারকের পাশাপাশি – তাঁকে সেরা একজন বিজনেস আইকন হিসেবেও ধরা হয়। বিজ্ঞান আর ব্যবসা ভালো বোঝার কারণেই তাঁকে কল্পনার জগতের হিরো আয়রন ম্যানের পাশাপাশি টমাস আলভা এডিসন এর মত বাস্তব দুনিয়ার হিরোর সাথে তুলনা করা হয়।
২০০৭ সালে প্রথম আয়রন ম্যান সিনেমার শুটিং এর আগের কথা। আয়রনম্যান চরিত্রে অভিনয় করা রবার্ট ডাউনি জুনিয়র ইলন মাস্কের স্পেস এক্স এর হেডকোয়ার্টারে গিয়েছিলেন তাঁর সাথে দেখা করতে। কারণ, লেখিকা এ্যাশলি ভেন্স তাঁর ইলন মাস্কের জীবনী বইয়ে লিখেছিলেন, “টনি স্টার্ক (আয়রন ম্যান এর আসল নাম) এবং ইলন মাস্ক আসলে একইরকম চরিত্রের মানুষ”। তাই আয়রনম্যান চরিত্রে অভিনয় করার আগে রবার্ট বাস্তবের আয়রনম্যানের সাথে দেখা করে তাঁর চালচলন ও কাজের ধরন সম্পর্কে আইডিয়া নিতে গিয়েছিলেন।
মাস্কের সাথে দেখা করার পর রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের প্রতিক্রিয়া ছিল এরকম: “যেটা আমার মাথা খারাপ করে দিয়েছে, তা হল তাঁর ব্যবসা পরিচালনার ধরন। এমন একজন মানুষ অবশ্যই অসাধারণ ব্যবসায়ী হবেন”
ইলন মাস্ক কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তা জানার চেষ্টা করেছিলেন শীর্ষস্থানীয় বিজনেস ও সেলফ ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিন “এ্যাডিক্টেড টু সাকসেস” এর নিয়মিত লেখক এবং “LiveaBusinessLife” এর কর্ণধার মোস্তফা ডাসট্রাস। তিনি মোট ৪টি বিষয় খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলো ইলন মাস্ককে অসাধারণ একজন বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেটর বানিয়েছে।
আমরা আমাদের পাঠকদের জন্য তাঁর সেই খুঁজে পাওয়া বিষয়গুলোই সংক্ষেপে তুলে ধরছি:
০১. তিনি অফিসে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বসই খুব ভয়ঙ্কর ধরনের চরিত্র হয়ে থাকেন। তাঁকে একটি কথা বলতে গেলে কর্মীদের ১০ বার ভাবতে হয়। এতেকরে আসলে প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষতি হয়। হয়তো কোনও কর্মী নতুন কোনও ভালো আইডিয়া পেল, কিন্তু বসের গম্ভীর ভাবের কারণে সে তা বলতেই সাহস পেল না। আবার মিটিংয়ে ভালো কোনও মতামত মাথায় এলেও অনেকে বসের সামনে মুখ খোলেন না। এটার কুফল সম্পর্কে বোঝা এবং কাজের পরিবেশকে বন্ধুত্বপূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানের। প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি সব সময়ে গম্ভীর হয়ে থাকেন, এবং অন্যদের সাথে দূরত্ব বজায়ে রাখেন – তবে এই কালচার পুরো প্রতিষ্ঠানেই ছড়িয়ে যায়। এবং নতুন আইডিয়া প্রকাশ হয় না। প্রতিষ্ঠানও বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারে না। –
ইলন মাস্ক এই ব্যাপারটা খুব ভালো বোঝেন, এবং তাঁর সবগুলো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা খুব সহজে তাঁর কাছে যেতে পারে এবং কথা বলতে পারে। তিনি তাঁর কর্মীদের ভালো মন্দের দেখভাল খুব ভালোমত করেন, যার ফলে কর্মীরাও নিজেদের কাজটি ঠিকমত করাকে দায়িত্ব মনে করে। – যেকারণে, তাঁর সবগুলো প্রজেক্টের কর্মীরা খুব মন লাগিয়ে কাজ করেন। ফলে প্রায় প্রতিটি প্রজেক্টই শতভাগ সাফল্য পায়। কর্মীরা তাঁকে সম্মান করে – কিন্তু ভয় পায় না। একারণেই নিজেদের আইডিয়া ও মতামত খুব সহজেই বসের কাছে পেশ করতে পারে – যা কোম্পানীর জন্যই ভালো।
কর্মীদের সাথে সহজ হতে পারা এবং তারা যেন তাদের কথা অকপটে বলতে পারে – এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা একটি দারুন মোটিভেশন। শুধুমাত্র সেরা বসরাই এই মোটিভেশন দিতে পারেন। এবং ইলন মাস্ক নি:সন্দেহে তাঁদের একজন।
০২. সততা
ইলন মাস্ক নি:সন্দেহে খুবই মেধাবী এবং জ্ঞানী একজন মানুষ। কিন্তু তিনি কখনও যা জানেন না, তা জানার ভান করেন না। কোনও কনফারেন্সে তাঁর অজানা কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি গোঁজামিল দিয়ে উত্তর দেয়ার চেষ্টা না করে, না জানার কথা সরাসরি স্বীকার করেন।
তাঁর প্রডাক্টের বর্ণনায় যা দেয়া থাকে, সেটাই পাওয়া যায়। কোনও বেশি বা কম নেই। এই কারণেই নাসার মত প্রতিষ্ঠান রকেট ও স্যাটেলাইটের মত জিনিস তাঁর কোম্পানী থেকে কেনে। কথা ও কাজে এক থাকা সত্যিকার সফল ব্যবসায়ী হওয়ার অন্যতম শর্ত। যারা এক ধরনের পন্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য ধরনের পন্য ক্রেতার হাতে তুলে দেয়, তারা আসলে ব্যবসায়ী নয় – এরা আসলে চোর। এই ধরনের ব্যবসায়ীরা কখনওই ইলন মাস্ক বা জ্যাক মা এর পর্যায়ে যেতে পারে না।
আপনাকে যদি সত্যিই বিশাল পর্যায়ের উদ্যোক্তা হতে হয়, তবে অবশ্যই সৎ হতে হবে। প্রতিশ্রুতি, কথা এবং কাজের মধ্যে কোনও অমিল থাকা যাবে না। ইলন মাস্ক এর এই একটি নীতিই তাঁর ব্র্যান্ড গুলোকে নিজ নিজ বাজারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হতে সাহায্য করেছে।
০৩. ক্রেতাদের সন্তুষ্টির ব্যাপারে কোনও ছাড় নয়
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০টি উদ্যোগের মধ্যে ৮ ব্যবসাই ব্যর্থ হয়। এর প্রধান একটি কারণ হল ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে না পারা। কোনও ব্যবসায়ী যদি সত্যিকার অর্থেই ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে পারে – তবে তার ব্যবসার সাফল্যের জন্য আর কিছু দরকার নেই। এমনকি প্রাথমিক অবস্থায় লস দিয়ে হলেও ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করা উচিৎ। ইন্টারনেটে বহু সার্চ ইঞ্জিন আছে, কিন্তু মানুষ তবুও শুধু গুগলেই সার্চ করে – কারণ, গুগল সেরা সার্চ রেজাল্টা দেখানোর চেষ্টা করে। এটা তাদের ফ্রি সার্ভিস – কিন্তু তারপরও তারা এটার পেছনে লাখ লাখ ডলার খরচ করে। এর কারণ, সন্তুষ্ট গ্রাহকরা গুগলকে বিশ্বাস করে এবং গুগলের অন্য সার্ভিসগুলো টাকা দিয়ে কিনতে দ্বিধা করে না।
এবার ইলন মাস্কের কথায় আসা যাক, ইবের কাছে তাঁর প্রথম ব্যবসা “পে-পাল” বিক্রী করে তিনি ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পেয়েছিলেন। সেই টাকার প্রায় পুরোটাই তিনি তাঁর নতুন কোম্পানী টেসলা এবং স্পেস এক্স- এ বিনিয়োগ করেন। কিছু ঝামেলার কারণে দু’টি কোম্পানীতেই টাকার সমস্যা দেখা দেয়।
এক সময়ে খবর বের হয় যে গাড়ির কোম্পানী টেসলার ফান্ডে মাত্র ৯ মিলিয়ন ডলার জমা আছে। যতগুলো গাড়ির অগ্রিম অর্ডার ছিল, এই পুঁজিতে তা বানানো সম্ভব ছিল না। এই অবস্থায় মাস্ক তাঁর নিজের ব্যক্তিগত টাকা থেকে ক্রেতাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য তৈর হয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি ঘোষণাও দিয়ে দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর তা করতে হয়নি। টেসলা ঠিকমতই ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল। কিন্তু এই ঘটনার ফলে টেসলা সম্পর্কে মানুষের ধারণাই অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। কোম্পানীর ফান্ডে টান পড়লে যখন বেশিরভাগ কোম্পানীর মালিক নিজের পকেট বাঁচাতে কোম্পানীকে দেউলিয়া ঘোষনা করানোর জন্য আদালতে ছোটেন, তখন মাস্ক নিজের পকেট থেকে ক্রেতাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেন। এই কারণেই তিনি বর্তমান সময়ের সেরা একজন পাবলিক ফিগার হতে পেরেছেন।
মাস্ক তাঁর ক্রেতাদের জন্য সব সময়েই সেরা পন্যটি বানানোর চেষ্টা করেন। পরীক্ষা ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করেন। তাঁর পন্যে কোনওরকম খুঁত থাকা চলবে না। আর যে কোম্পানীই ক্রেতাদের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে, তা এক সময়ে না এক সময়ে বিরাট কোম্পানীতে পরিনত হয়।
০৪. নতুন কিছু খোঁজার পেছনে বিনিয়োগ করা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় যেসব ব্যবসায়ী আছেন, তাঁদের প্রায় সবাই লাভের চেয়ে প্যাশনকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁরা ব্যবসা থেকে আয় করার পাশাপাশি এমন কিছু করতে চান – যা মানুষের জীবনে নতুন কিছু নিয়ে আসবে। এর পাশাপাশি ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম লেখাবে।
জেফ বেজোস অথবা স্টিভ জবস এর মত উদ্যোক্তারা পৃথিবীকে নতুন কিছু দিতে পেরেছেন বলেই তাঁরা এত সম্মানিত ও বিখ্যাত।
আর তাঁদের পরের যুগের অন্যতম বিখ্যাত উদ্যোক্তা নি:সন্দেহে ইলন মাস্ক। এর কারণ, তিনিও নতুন কিছু করেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত পে-পাল অনলাইন লেনদেনের ধারণাই পাল্টে দিয়েছিল। আগে যেখানে ব্যাঙ্কে ছোটাছুটি করে, কয়েক দিন অপেক্ষা করে টাকা লেনদেন করতে হত – সেখানে পে পাল এর মাধ্যমে মানুষ কয়েক সেকেন্ডে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে টাকা লেনদেন করার সুবিধা পেয়েছিল।
পে-পালের পর কিন্তু মাস্ক থেমে যাননি। পরিবেশ বান্ধব ইলেক্ট্রিক গাড়ি টেসলা বাজারে এনেছেন তিনি। তাঁর আগে কেউ ভাবতেও পারেনি যে রকেটের যন্ত্রাংশ একবারের বেশি ব্যবহার করা যায়। তাঁর স্পেস এক্স এর আগে একটি রকেট একবারই ব্যবহার করা যেত। যার ফলে খরচ হত কোটি কোটি ডলার। তাঁর কারণে রকেটের খরচ বহুগুণ কমে গেছে।
মাস্ক এখনও তাঁর ব্যবসার লাভের অনেকটাই নতুন গবেষণার পেছনে ঢালেন। তাঁর সোলার সিটি প্রজেক্টের মাধ্যমে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মানুষের সব প্রয়োজন মেটানোর বিষয়ে গবেষণা চলছে। – এমন আরও বহু নতুন আইডিয়া নিয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন।
তাঁর এই নতুন নতুন আইডিয়ার পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় করা তাঁর এত খ্যাতি ও সাফল্যের আরেকটি প্রধান কারণ। একজন উদ্যোক্তাকে শুধু ব্যবসা করলেই চলে না, অনন্য হতে হলে তাঁকে অন্যদের নতুন কিছু দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।