RUSHvsUKR: ইউক্রেনে জয়ের অপেক্ষায় রাশিয়া, পিছিয়ে পড়ছে ইউক্রেন বাহিনী, পশ্চিমাদের মুখে চপেটাঘাত

ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক অভিযান এক বছর পার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়েও দুই দেশের দৃশ্যমান কোনো শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। তবে ইউক্রেনে আক্রমণের মাত্রা আরো বাড়িয়েছে রুশ সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে যুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
যুদ্ধমাঠের সবশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, রাশিয়ার ওয়াগনার গ্রুপ ইউক্রেনের দোনবাস অঞ্চলের শহর বাখমুতের পূর্ব অংশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। আর ইউক্রেনের বাহিনী শহরের পশ্চিম অংশে এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

তবে মস্কোর দাবি— বাখমুত দখলে নিয়েছে তারা। দেশটি বলছে, তাদের (রাশিয়া) সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের পূর্ব দোনবাস অঞ্চল দখলের একটি পদক্ষেপের অংশ।

এদিকে ইউক্রেন বলছে, বাখমূত তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনী বিভ্রান্ত করতে তারা কূটকৌশল অবলম্বন করেছে।

সম্প্রতি অনেকের মনে একটি ধারণা বেশ ভালোভাবে চাউর হচ্ছে। ধারণাটি হলো পারস্পরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধে অচলাবস্থা চলতেই থাকবে। আর রাশিয়ার সৈন্যদের রক্ত ঝরতেই থাকবে।

তারা এও বলছেন যে ইউক্রেনের খুনে যুদ্ধক্ষেত্রে যেভাবে রুশ সেনাদের রক্ত ঝরছে, তাতে রাশিয়ার ভয়ংকর যুদ্ধ দানব অন্তত বিরতিতে যেতে বাধ্য হবে। যারা এসব বিশ্বাসের মধ্যে আছেন, তারা একটা কল্পনার জগতে বাস করছেন।

বাস্তবতা হলো— ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর আকার ছোট হয়ে আসছে, পশ্চিমাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে টান পড়ছে এবং ন্যাটোর অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিমের দুর্বলতা বুঝতে পেরে রাশিয়া এখন ইউক্রেনের প্রতিরোধ শক্তি ভেঙে দিতে এবং তাদেরকে পদানত করতে সম্ভাব্য সব উপায় ব্যবহার করছে। শেষের এই শুরুটা সম্ভবত ইউক্রেনের বাখমুত শহরে ঘটেছে।

বাখমুতে যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা-

বাখমুত শহরটিকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলার জন্য রুশ বাহিনী কয়েক মাস সময় ব্যয় করেছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষণা করেছিলেন, বাখমুতে তার বাহিনী তিক্ত পরিণতি পর্যন্ত লড়ে যাবে। কিয়েভ থেকে এ ধরনের বীরোচিত ঘোষণা দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের যে রূঢ় বাস্তবতা, সেখান পর্যন্ত সেই আওয়াজ পৌঁছাতে পারে না।

মার্চের শুরুতেই এটা দৃশ্যমান যে, রুশরা বাখমুতে ইউক্রেনীয়দের রক্তশূন্য করে মারার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটা কাজ করছে। ফলে অবরুদ্ধ শহরটি থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রত্যাহার করে নেয়া অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।

বাখমুত শহর কেন গুরুত্বপূর্ণ-

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাখমুত অবশ্যই দুই পক্ষের জন্যই এককভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। কেননা, নিপার নদীতীরবর্তী পূর্ব ইউক্রেনের গ্রামগুলোতে যাওয়ার রাস্তা এই শহরটি দিয়েই। ব্যবসা ও বাণিজ্যের প্রধান একটি কেন্দ্র হওয়ায় নিপারকে ইউক্রেনের ধমনি বলা হয়। এটা ইউক্রেনের জন্য ভূকৌশলগত প্রবেশদ্বারও। সে কারণেই নিপার নদীর দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন দুই পক্ষের সেনারা কয়েক মাস ধরে লড়াই করে চলেছেন।

বাখমুত শহর থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের হটিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো, নিপার অভিমুখে রুশ সেনাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকা এবং ঐ অঞ্চলকে বাকি ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। নিপার নদীবর্তী অঞ্চলে রাশিয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানে হলো, ঐ দিক থেকে ক্রিমিয়ায় সেনা অভিযান চালানোর জন্য ইউক্রেনীয়দের যে অসদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে, সেটা ব্যর্থ হওয়া।

এছাড়া নিপার হারানোর অর্থ হলো, ইউক্রেনীয়দের রাষ্ট্রের ধীর ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর সূচনা। কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর লাগুক না কেন, রুশরা অন্য কোথাও নড়বে না। ইতিহাসে তারা বিভিন্ন যুদ্ধে যেভাবে লড়েছে এখানেও ঠিক তেমনটাই লড়ে করে যাবে। বিপুল জনবল, নৃশংসতা ও সময় নিয়েই তারা লড়ে যাবে।

মস্কো এই যুদ্ধে পুরোপুরি সর্বেসর্বা অবস্থানে রয়েছে। যুদ্ধের এখন এমন এক পর্যায়, রাশিয়া যদি দৈবক্রমে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে না পড়ে, তাহলে ইউক্রেনের তুলনায় রুশ বাহিনীর সংখ্যাতাত্ত্বিক যে শ্রেষ্ঠত্ব তাতে রাশিয়ার জন্য চূড়ান্ত বিজয় অপেক্ষা করছে।

পশ্চিমাদের মুখে রাশিয়ার চপেটাঘাত-

আর ইউক্রেনকে এই বিপর্যয়ে ফেলার মূলহোতা আমেরিকা। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়াসহ মুসলিম–অধ্যুষিত দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’-এর মতো সামরিক অভিযান সুসংহত কৌশল না থাকায় ব্যর্থ হয়েছে। ইউক্রেনেও ব্যর্থ হচ্ছে। ইউক্রেন দখলের মাধ্যমে যুদ্ধে অস্ত্র ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে বিপদে ফেলা পশ্চিমের এই দেশটির মুখে চপেটাঘাত হবে রাশিয়ার।

সম্প্রতি পশ্চিমা নেতারা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উৎখাত এবং রাশিয়ান ফেডারেশন ভেঙে টুকরা করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করছেন। সব পরিস্থিতি যদি অনুকূলে থাকে এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য যদি একটি বিশ্বযুদ্ধ হয়, তারপরও এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ অসম্ভব একটা বিষয়। কিন্তু ওয়াশিংটনে কল্পনাজগতে বসবাসকারী নীতিনির্ধারকেরা এই বিভ্রমের মধ্যেই নিজেদের ছুড়ে দিয়েছেন। আর অসম্ভব এক স্বপ্ন দেখিয়ে ইউক্রেনীয়দের কৌশলগত আত্মহত্যার পথে নিয়ে গেছেন।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইউক্রেন প্ররোচনার ফাঁদে পা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন এক হঠকারী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যেটা জেতা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর যুদ্ধ বড় পরিসরে ছড়ানোর যে প্ররোচনা পশ্চিমারা দিচ্ছে, তার জন্য নিজেরাও প্রস্তুত নয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ওয়াশিংটনকে হয় একটা অলৌকিক ঘটনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, নাহয় রাশিয়া যত দিন না পর্যন্ত ইউক্রেনকে চুরমার করে ফেলছে, তত দিন অপেক্ষা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ভূকৌশলগত অবস্থান এবং ন্যাটো জোটের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এক মেরুর বিশ্ব ব্যবস্থার বদলে নতুন বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *