ব্রিটিশদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে মালগাড়ি লুট! ১১০ বছরের সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও পূজিত মাজদিয়ার ‘ডাকাত কালী’

ইতিহাস, অলৌকিক বিশ্বাস আর ঐতিহ্য—এই তিনের মেলবন্ধনে নদীয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের মাজদিয়ায় আজও অমলিন ১১২ বছরের পুরনো ‘ডাকাত কালী’র মাহাত্ম্য। ব্রিটিশ শাসনকালে যাঁরা ছিলেন ইংরেজ পুলিশের চোখের বালি ও আতঙ্কের অপর নাম, সাধারণ ও সহায়সম্বলহীন মানুষের কাছে তাঁরাই ছিলেন সাক্ষাৎ ত্রাতা। সেই ইতিহাস ও জনশ্রুতিকে বুকে নিয়েই প্রতি বছর দীপাবলিতে সাড়ম্বরে পূজিত হন মাজদিয়ার এই ঐতিহ্যবাহী ডাকাত কালী দেবী, যাঁকে স্থানীয় অনেকেই ‘কামনা কালী’ নামেও ডাকেন।

রেলগাড়ি লুট ও পুজোর নেপথ্য ইতিহাস:

জনশ্রুতি অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ১১০ বছর আগে তীব্র খাদ্যসংকটে ছারখার হয়ে গিয়েছিল কৃষ্ণগঞ্জ এলাকা। অনাহারে দিন কাটছিল বহু সাধারণ মানুষের। সেই সময় এলাকার একদল দুঃসাহসী যুবক সিদ্ধান্ত নেন অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার। কথিত আছে, ইছামতী নদীর সেতুর কাছে রেলের সিগন্যাল লাল করে একটি মালগাড়ি থামান তাঁরা এবং সেখান থেকে চালের বস্তা লুট করেন।

এরপর সেই চাল ও নিজেদের আত্মগোপনের জন্য তাঁরা আশ্রয় নেন পাশের এক গভীর জঙ্গলে। অমাবস্যার রাতে মায়ের কাছে ডাকাত দল প্রার্থনা করেছিল, ইংরেজ পুলিশ যেন তাদের ও চালের বস্তার খোঁজ না পায়। বিশ্বাস করা হয়, দেবীর কৃপায় পুলিশ সেদিন তাঁদের কিছুই টের পায়নি। মনস্কামনা পূরণ হতেই গভীর জঙ্গলে অমাবস্যার তিমির রাতে দেবী কালীর আরাধনা শুরু করেন তাঁরা। সেই থেকেই দেবীর নাম হয়ে যায় ‘ডাকাত কালী’।

চাঁদা ছাড়া পুজো, আজ যেখানে মন্দির:

একসময়ের সেই নিবিড় জঙ্গল ঘেরা স্থানটিতে আজ গড়ে উঠেছে মায়ের স্থায়ী মন্দির। তবে ঐতিহ্য ও নিয়মে এতটুকু পরিবর্তন আসেনি:

স্বতঃস্ফূর্ত দান: এই পুজোর জন্য ঘরে ঘরে গিয়ে কোনও জোরজুলুম করে চাঁদা তোলা হয় না। এলাকার মানুষের ভালোবেসে দেওয়া স্বতঃস্ফূর্ত দানেই পুজোর সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হয়।

মানত ও বলিকথা: মায়ের কাছে ভক্তদের অটল বিশ্বাস। বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ মনস্কামনা পূরণের আশায় মানত করতে আসেন। এখানে এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে মানত ও বলিপ্রথা পালিত হয়।

ভোগ ও বিসর্জন: পুজোর দিন মন্দির প্রাঙ্গণেই অন্নভোগ রান্না করা হয় এবং পুজো শেষে সাধারণ দর্শনার্থীদের মধ্যে তা বিতরণ করা হয়। প্রতিমা বিসর্জনের দিন মাকে প্রথমে এলাকার বেশ কিছু ব্যবসায়ী ও প্রাচীন বাসিন্দাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শ্রদ্ধার সাথে বরণ পর্ব শেষ হওয়ার পর ইছামতী নদীতে দেবীর বিসর্জন সম্পন্ন হয়।

কালীপুজোর রাতে কেবল কৃষ্ণগঞ্জ নয়, নদীয়া ও আশেপাশের জেলার হাজার হাজার মানুষ মাজদিয়ার এই ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে ভিড় জমান।

চন্দননগরের আলো ও ঢাকের তালে সেজে উঠেছে জলপাইগুড়ি

উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়িতেও আলোর উৎসবে মেতেছেন শহরবাসী। শহরের বিভিন্ন কালীপুজো মণ্ডপ সেজে উঠেছে হুগলির চন্দননগরের বিশ্বখ্যাত বাহারি আলোকসজ্জায়।

জলপাইগুড়ি শহরের অন্যতম আকর্ষণ উদয়ন ক্লাবের শোভাযাত্রায় দেখা গেল চরম উন্মাদনা। ঢাকের বোল, আলো আর আমোদপ্রমোদের মধ্য দিয়ে শ্যামামায়ের মূর্তি মণ্ডপে নিয়ে আসেন ক্লাবের উদ্যোক্তারা। পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের সানন্দ অংশগ্রহণে আলো আর ঢাকের শব্দে গোটা এলাকা উৎসবের আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *