বাংলার যে গ্রামে ‘AI যুগেও’ পৌঁছয়নি বিদ্যুৎ, নতুন সরকারে অবশেষে ঘুচল অন্ধকার

একাল বদলে গেছে প্রযুক্তির আলোয়। বিশ্বজুড়ে যখন এআই (AI) এবং আধুনিক প্রযুক্তির ঝড় বইছে, ভারতও সেই তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে সামনের দিকে। কিন্তু তার মাঝেই প্রদীপের নিচে জমে থাকা ঘোর আঁধারের এক অবিশ্বাস্য ছবি সামনে এলো পশ্চিমবঙ্গ থেকে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৭৯ বছর পর অবশেষে আলোর দিশা পেল হুগলির এক প্রত্যন্ত গ্রাম! এতদিন অন্ধকারেই দিন কেটেছিল যে বাসিন্দাদের, দীপাবলির ঠিক মুখে তাঁদের ঘরে প্রথমবার জ্বলে উঠল বৈদ্যুতিক আলো।

হুগলির তারকেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত অস্ত্রদত্তপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চকদহ গ্রামটির এই অলৌকিক বদলে এখন খুশির হাওয়া চারিপাশে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটানো প্রায় ৪০০টি আদিবাসী পরিবারের কাছে এই আলো পৌঁছানো যেন এক নতুন জীবনের সূচনা।

স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর ঘোচালো ‘আঁধার রাজ’

অস্ত্রদত্তপুরের ওই গ্রামে বসবাসকারী সিংহভাগ মানুষই আদিবাসী সম্প্রদায়ের এবং তাঁরা মূলত কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন। এতদিন বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন জীবনযাপনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেত গ্রামের ছোট্ট শিশুরা। সন্ধ্যে নামলেই প্রদীপ কিংবা লণ্ঠনের ধোঁয়ায় পড়াশোনা করতে গিয়ে কালঘাম ছুটত তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দা রুই বাড়ি আবেগপ্লুত কণ্ঠে জানান, “স্বাধীনতার পর এই প্রথম আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ এলো। আমরা যে কতটা খুশি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।”

“খুঁটি পুঁতে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সংযোগ দেওয়া হয়নি!”

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, কয়েক বছর আগেই গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তাতে কোনোরকম বৈদ্যুতিক তার টানা হয়নি। ফলে খুঁটি দাঁড়িয়ে থাকলেও আলোর মুখ দেখা অধরাই থেকে গিয়েছিল তাঁদের। রাজনৈতিক সমীকরণের বলি হয়েই কি তবে এতদিন অন্ধকারে কাটাতে হলো পুরো গ্রামকে? উঠছে সেই বিস্ফোরক প্রশ্নও।

“বিজেপিকে ভোট দেয় বলেই বিদ্যুৎ আটকে রাখা হয়েছিল”, তোপ বিজেপি বিধায়কের

গ্রামের এই দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎহীনতার নেপথ্যে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকেই দায়ী করেছেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক সন্তু পান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “১৯৯৭-৯৮ সাল থেকেই এই গ্রামের মানুষ বিজেপিকে সমর্থন করে আসছেন এবং ভোট দিচ্ছেন। আর ঠিক সেই কারণেই এতদিন শাসকদলের নজর পড়েনি এই গ্রামে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাঁদের বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।”

বিধায়ক সন্তু পান আরও জানান, নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন তিনি গ্রামবাসীদের এই চরম দুর্ভোগের কথা জানতে পারেন। জয়ী হলে গ্রামে আলো নিয়ে আসাই হবে তাঁর প্রথম কাজ—এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। সেই কথা রাখতেই গত মাসখানেক ধরে জেলা বিদ্যুৎ দফতরের উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।

১০০টিরও বেশি পরিবার পাচ্ছে বিদ্যুৎ সংযোগ

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিপিএল (BPL) তালিকাভুক্ত পরিবারগুলি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই বিদ্যুৎ সংযোগ সুবিধা পাচ্ছে। ইতিমতেই গ্রামের প্রায় ৫০টি বাড়িতে নতুন মিটার বক্স বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। জানা যাচ্ছে, খুব শীঘ্রই শতাধিক পরিবার সরাসরি এই বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় চলে আসবে।

দীপাবলির উৎসবে প্রদীপের পাশাপাশি এবার বৈদ্যুতিক আলোয় মেতে উঠবে হুগলির এই আদিবাসী গ্রাম। দীর্ঘ ৭৯ বছরের অপেক্ষা ও বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে গ্রামের প্রতিটি কোণায় এখন শুধুই উৎসবের মেজাজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *