তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিল হ্যাকাররা! ইউরোপের সুপারমার্কেটের হিমঘরে ভয়ংকর সাইবার হামলা, পচে গেল টন টন খাবার

ইউরোপজুড়ে সুপারমার্কেট এবং খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর সাইবার আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার একযোগে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সুপারমার্কেটের রেফ্রিজারেটর এবং ফ্রিজারগুলোকে লক্ষ্য করে এই বড় ধরনের সাইবার হানা চালানো হয়। এর ফলে কোল্ড স্টোরেজ সিস্টেমগুলোর তাপমাত্রা হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং লক্ষ লক্ষ ইউরো মূল্যের তাজা ও হিমায়িত খাদ্যপণ্য নিমেষেই নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই সাইবার আক্রমণের প্রভাব এসে পড়েছে যুক্তরাজ্যের মাংস শিল্পেও। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিট সাপ্লায়ার্স (AIMS)-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের সাড়ে তিনশোরও বেশি সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কয়েকটি এই হামলার কবলে পড়েছে।

অবশ্য AIMS স্পষ্ট করেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মজুত থাকা মাংসের গুণগত মান নষ্ট হয়নি। তবে সংস্থার যোগাযোগ প্রধান টনি গুডজার সতর্ক করে বলেছেন যে, এই ঘটনা সমগ্র খাদ্য শিল্পের জন্য একটি বড় রেড অ্যালার্ট। খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত যেকোনো সংস্থাই এখন হ্যাকারদের টার্গেটে পরিণত হতে পারে, যা সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিরাট চিন্তার বিষয়।

কীভাবে চালানো হলো এই হামলা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারমার্কেটের রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রযুক্তির (Remote Control Tech) দুর্বলতাকেই সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছে হ্যাকাররা। বেলজিয়ামের রেফ্রিজারেশন কোম্পানি ‘সাবকোবেল’-এর তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা অত্যন্ত চতুরভাবে রেফ্রিজারেটর ইউনিটগুলোকে জোর করে ‘ডিফ্রস্ট মোড’-এ পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে হিমঘরগুলোর তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং খাবার দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

এই আকস্মিক হামলায় বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গের প্রায় ৪০টি ‘ডেলহাইজ’ সুপারমার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, এস্তোনিয়া এবং ফিনল্যান্ডের বেশ কিছু খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রও এর খেসারত দিয়েছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার বাধ্য হয়েই ফেলে দিতে হয়েছে বিক্রেতাদের। অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ ইউরো আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, এর আগে গত অক্টোবরেও ফ্রান্সে শত শত সুপারমার্কেট এবং খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ঠিক একইভাবে সাইবার হামলার মুখে পড়েছিল। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকরা অনেক আগেই এই ধরনের সিস্টেমের ত্রুটিগুলো নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

পুরোনো প্রযুক্তি ও এআই (AI) বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (NCSC)-এর প্রধান নির্বাহী ড. রিচার্ড হর্ন জানিয়েছেন, ব্রিটেনেও এমন কিছু ঘটনার খোঁজ মিলেছে যেখানে সিস্টেমের প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত সংস্থাগুলোকে দ্রুত সতর্ক করতে তাঁদের টিম সারারাত ধরে কাজ করেছে।

ড. হর্নের মতে, বহু কোম্পানি এখনও অত্যন্ত পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চলেছে। এই সিস্টেমগুলো যেমন নিয়মিত আপডেট করা হয় না, তেমনই ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো নিরাপদ স্থানেও সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে হ্যাকারদের পক্ষে খুব সহজেই মূল সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে সতর্ক করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর সাহায্য নিয়ে এখন সাইবার আক্রমণকারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বের করছে এবং মুহূর্তের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করছে। ইউরোপের এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন যুক্তরাজ্যের সুপারমার্কেটগুলোও তাদের সাইবার নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *