রামের অযোধ্যা ফেরা থেকে মহাবীরের নির্বাণ লাভ— দীপাবলি ঘিরে লুকিয়ে রয়েছে কোন কোন বিরাট রহস্য?

অন্ধকারের ওপর আলোর জয়, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং নতুন আশার চিরন্তন বার্তা বহন করে নিয়ে আসে আলোর উৎসব— দীপাবলি (Diwali 2026)। ভারতের অন্যতম এই মহা উৎসব ঘিরে প্রতি বছর মেতে ওঠেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। বাড়ি সাজানো, সারি সারি প্রদীপ জ্বালানো, রঙিন আলপনা, মিষ্টিমুখ এবং দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের আরাধনায় উদযাপিত হয় এই বিশেষ দিনটি। তবে দীপাবলি কেবল একটি নির্দিষ্ট পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও ধর্মে নানা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঘটনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই উৎসবের তাৎপর্য।
দীপাবলি ২০২৬: লক্ষ্মীপুজোর শুভ সময়সূচি
চলতি বছর (২০২৬) আগামী ৮ নভেম্বর, রবিবার পালিত হবে দীপাবলি। হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকার কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। এই দিন সন্ধ্যায় দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পুজো অত্যন্ত ফলদায়ী বলে মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই পবিত্র তিথিতে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো এবং প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করলে ঘরে সুখ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের আগমন ঘটে।
পঞ্জিকা মতে ২০২৬ সালের দীপাবলির শুভ মুহূর্তগুলি হল:
লক্ষ্মীপুজোর মুহূর্ত: বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত।
পুজোর মোট সময়কাল: ১ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট।
প্রদোষ কাল: বিকেল ৫টা ৩১ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৯ মিনিট পর্যন্ত।
বৃষভ কাল: বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৫৫০ মিনিট পর্যন্ত।
অমাবস্যা তিথি শুরু: ৮ নভেম্বর সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে।
অমাবস্যা তিথি শেষ: ৯ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে।
কেন পালিত হয় দীপাবলি? একাধিক পৌরাণিক কাহিনি
দীপাবলির মূল দর্শন হলো অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলো জ্বালানো এবং অশুভ শক্তির বিনাশ করা। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব উদযাপনের নেপথ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস:
রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন: হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, ১৪ বছরের দীর্ঘ বনবাস কাটিয়ে স্ত্রী সীতা ও ভাই লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে লঙ্কার রাজা রাবণকে বধ করে অযোধ্যায় ফিরেছিলেন ভগবান রাম। তাঁদের ফেরার আনন্দে অযোধ্যার অধিবাসীরা গোটা নগরী প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তুলেছিলেন। সেই থেকেই দীপাবলিতে প্রদীপ জ্বালানোর এই ঐতিহ্য চলে আসছে।
নরকাসুর বধ ও কৃষ্ণের বিজয়: দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বহু অঞ্চলে দীপাবলির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভগবান কৃষ্ণের হাতে অত্যাচারী অসুর নরকাসুরের বধের কাহিনি। বন্দি নারীদের মুক্ত করে শান্তি ফিরিয়ে আনার এই ঘটনা ‘নরক চতুর্দশী’ বা ‘ছোট দীপাবলি’ হিসেবে পালিত হয়।
শিখ ও জৈন ধর্মে দীপাবলির বিশেষ গুরুত্ব
দীপাবলি শুধু হিন্দু ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; শিখ ও জৈন সম্প্রদায়ের কাছেও এই দিনটির রয়েছে বিশাল আধ্যাত্মিক তাৎপর্য:
শিখ ধর্মে ‘বন্দি ছোড় দিবস’: দীপাবলির দিন শিখ সম্প্রদায় ‘বন্দি ছোড় দিবস’ পালন করে। এই দিনটি ষষ্ঠ শিখ গুরু শ্রী গুরু হরগোবিন্দ সাহিবজির গ্বালিয়র দুর্গ থেকে মুক্তির স্মারক। তাঁর সঙ্গে ৫২ জন রাজাও মুক্তি পেয়েছিলেন। গুরুদ্বারগুলি আলোকমালায় সাজিয়ে এই দিনটি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের বার্তা বহন করে।
জৈন ধর্মে মহাবীরের নির্বাণ: জৈনদের কাছে দীপাবলি হলো ২৪তম তীর্থঙ্কর ভগবান মহাবীরের নির্বাণলাভ বা মোক্ষপ্রাপ্তির স্মরণদিবস। বিহারের পাপাপুরীতে তিনি মোক্ষ লাভ করেছিলেন। তাঁর অহিংসা ও আত্মসংযমের শিক্ষাকে স্মরণ করে এই দিনে প্রদীপের আলোয় অন্তরের অজ্ঞতা দূর করার প্রার্থনা করা হয়।
পাঁচ দিন ধরে চলে উৎসবের আমেজ
দীপাবলি মূলত একটি পাঁচ দিনের বর্ণাঢ্য উৎসব। ধনতেরস, নরক চতুর্দশী, দীপাবলি, গোবর্ধন পুজো এবং ভাইফোঁটা— এই পাঁচটি পবিত্র পর্বের মধ্য দিয়ে উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে। ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ছোঁয়া দেখা যায় এর উদযাপনেও। উত্তর ভারতে রামের অযোধ্যা ফেরা প্রধান, দক্ষিণ ভারতে নরকাসুর বধ, পশ্চিম ভারতে নতুন খাতা পুজোর সূচনা এবং পূর্ব ভারতে (বিশেষত বাংলা, ওড়িশা ও অসম) মা কালীর আরাধনায় মেতে ওঠেন ভক্তরা।
প্রদীপের আলো যেমন রাতের অন্ধকার দূর করে, তেমনই মানুষের মন থেকে সমস্ত নেতিবাচকতা ও অজ্ঞতা মুছে ফেলে আশা ও ইতিবাচকতার বার্তা দেয় দীপাবলি। পুরোনো সম্পর্কগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে নিয়ে এবং আলোর রোশনাইয়ে জীবনকে ভরিয়ে তোলার এই মহোৎসবে মেতে ওঠে গোটা দেশ।