৩০ লাখ প্রদীপের আলোয় মিটছে কান্না! অযোধ্যার দীপাবলিতে কীভাবে বদলে গেল হাজার হাজার মৃৎশিল্পীর ভাগ্য?

‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’— অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা করার এই বৈদিক প্রার্থনাই বৈদিক দর্শনের মূল ভিত্তি। তবে সেই আলো যখন কোনো অসহায় ও প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকা মানুষের আঙিনায় স্বাবলম্বিতার উজ্জ্বল বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়, তখন তার দীপ্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।

চলতি বছর অযোধ্যায় সরযূর তীরে যখন একযোগে ৩০ লক্ষ মাটির প্রদীপ জ্বলে উঠবে, তা কেবল ত্রেতাযুগের স্মৃতিচারণ বা ভক্তির ধর্মীয় উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হবে সেই সমস্ত মেহনতি হাতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মানের পর্ব, যাঁরা নিজেদের নিপুণ দক্ষতায় মাটিকে রূপ দিয়ে এই আলোক উৎসবকে বাস্তবে সম্ভব করে তুলেছেন।

ঐতিহ্যবাহী মেধার পুনর্জন্ম ও আত্মনির্ভরতা

পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের ‘অন্ত্যোদয়’ ধারণার মূল কথা হলো— আর্থিক পরিকল্পনার সফলতা মাপতে হবে সমাজের উচ্চবিত্তের সমৃদ্ধি দিয়ে নয়, বরং একদম নিচের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির অবস্থার পরিবর্তন দিয়ে। অযোধ্যার এই ‘দীপ উৎসব’ (Deepotsav) সেই ভাবধারাকেই বাস্তবের জমিতে রূপ দিয়েছে। মাটির একটি ছোট্ট প্রদীপ কেবল জল, মাটি আর আগুনের মিলন নয়; তার সঙ্গে মিশে থাকে কুমোরের ঘাম, তাঁর পরিবারের সোনালী আশা এবং বংশানুক্রমিক শিল্পের স্পন্দন।

অথচ এক দশক আগেও আধুনিকতার জাঁতাকলে পড়ে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রায় ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। বিগত সরকারগুলোর উদাসীনতায় যে হাত মাটি থেকে সোনা ফলার জাদু দেখাত, অভাবের তাড়নায় তাঁরা ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন মহানগরের উদ্দেশ্যে। মাটির কারিগরেরা অদক্ষ দিনমজুর হিসেবে খাটতে বাধ্য হচ্ছিলেন।

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় এসেই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেন। ‘এক জেলা এক পণ্য’ (ODOP) প্রকল্পের মাধ্যমে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, অযোধ্যার বিশাল দীপ উৎসব সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করে দিল। যারা গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই আজ নিজের ভিটেয় ফিরে এসেছেন। বছর বছর লক্ষ লক্ষ প্রদীপের চাহিদা স্তব্ধ হয়ে যাওয়া কুমোরের চাককে নতুন গতি দিয়েছে। যখন কোনো সন্তান তাঁর বাবার সাথে কুমোরের চাকে হাত মিলিয়ে কাজ করে এবং উপার্জিত অর্থ পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়, তখন সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ব্যবধান ঘুচে যায়।

‘লোকাল ফর ভোকাল’ এবং বিশ্বরেকর্ড

এই বিশাল আয়োজনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিকেন্দ্রীকরণ। অযোধ্যা একাই এত বিশাল পরিমাণ প্রদীপ যোগান দিতে পারত না। ফলে এই সুবিধার প্রসার ঘটেছে সমগ্র অবধ, পূর্বাঞ্চলসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায়। গোন্ডা, বস্তি, গোরক্ষপুর, আজমগড় থেকে বুন্দেলখণ্ড— সর্বত্র তৈরি হচ্ছে প্রদীপ। সপ্তাহখানেক আগে থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে কারিগরেরা প্রদীপ বানিয়ে অযোধ্যায় পাঠাচ্ছেন। এটি ‘লোকাল ফর ভোকাল’ ও ‘আত্মনির্ভর ভারত’ সংকজল্পের এক বাস্তব জীবন্ত উদাহরণ।

ইতিমধ্যেই অযোধ্যার এই দীপ উৎসব গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে (Guinness Book of World Records) নাম নথিভুক্ত করেছে। কিন্তু এই কীর্তিমানের আসল অংশীদার শুধু প্রশাসন বা পর্যটন দফতর নয়; এর আসল দাবিদার সেই সব অনামী মৃৎশিল্পীরা, যাঁদের হাতের তৈরি প্রদীপে আলোকিত হয় সরযূর ঘাট।

কর্মসংস্থান ও আধুনিক যুগে মাটির ছোঁয়া

ধর্ম ও সংস্কৃতিকে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে পরিণত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। ‘মাটি কলা বোর্ড’ গঠন এবং ইলেকট্রিক চাকের মতো আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করার ফলে কুমোর পরিবারগুলোর জীবনে নতুন জোয়ার এসেছে। ৩৩ লাখ প্রদীপের সরাসরি সরকারি অর্ডার মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমিয়েছে এবং কারিগরদের কষ্টের যোগ্য মূল্য নিশ্চিত করেছে।

আজকের তরুণ প্রজন্মও ঐতিহ্য ও মাটির শিকড়ে ফিরে আসছে। শুধু প্রদীপ নয়, মাটির তৈরি নানান শিল্পকর্ম, মূর্তি ও শো-পিস আজ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। শহরের তরুণদের কাছে প্লাস্টিকের বদলে ‘কুলহড়’-এর (মাটির ভাঁড়) চা প্রথম পছন্দ হয়ে উঠছে, যার সরাসরি আর্থিক লাভ পৌঁছাচ্ছেন এই মৃৎশিল্পীদের ঘরে।

অযোধ্যার এই দীপ উৎসব বস্তুত এক মহাযজ্ঞ। প্রদীপে জ্বলা তেল হয়তো ভৌতিক, কিন্তু তার শিখা থেকে যে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, তা উত্তরপ্রদেশের স্বাবলম্বী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে। এবার দীপাবলিতে সরযূ নদীর ঘাট যখন কোটি আলোয় ঝলমল করে উঠবে, তখন প্রদীপের আলোর পেছনে কুমোরের চাকে ঘাম ঝরানো সেই নরম হাতগুলোকে স্মরণ করতে ভুলবেন না— যাঁদের ছাড়া এই আলো ছড়ানো কখনই সম্ভব হতো না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *