ভুতুড়ে ইতিহাস নাকি অলৌকিক সঙ্কেত? ভারতের বৃহত্তম গুম্ফা তাওয়াং মনাস্ট্রি তৈরির পেছনের সত্যিটা কী?

পূর্ব হিমালয়ের ঘন অরণ্য ও কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকার কোলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের বৃহত্তম এবং রহস্যময় বৌদ্ধ গুম্ফা—তাওয়াং মনাস্ট্রি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটি কেবল আধ্যাত্মিকতার প্রতীকই নয়, বরং বৌদ্ধ শিক্ষা ও স্থাপত্যের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। তবে শুধুই কি প্রকৃতির সৌন্দর্য? ১৭ শতকের প্রাচীন এই মনাস্ট্রিকে ঘিরে রয়েছে এমন কিছু লোককথা ও অলৌকিক ইতিহাস, যা শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়!

তাওয়াং মনাস্ট্রির ইতিহাস ও এর নামের মাহাত্ম্য

স্থানীয়ভাবে এই মনাস্ট্রিকে ‘গাদেন নামগিয়াল লাতসে’ নামে ডাকা হয়। তিব্বতি ভাষায় এর অর্থ হলো “সম্পূর্ণ বিজয়ের স্বর্গীয় উদ্যান”। ইতিহাস বলে, ১৬৮০-৮১ সাল নাগাদ পঞ্চম দলাই লামার নির্দেশে মেরাক লামা লোদ্রে গিয়াৎসো এটি নির্মাণ করেছিলেন।

সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মনাস্ট্রি। দূর থেকে দেখলে একে বিশাল এক কেল্লা বা দুর্গের মতো মনে হয়। ৯২৫ ফুট দীর্ঘ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এই তিনতলা ভবনে রয়েছে মোট ৬৫টি থাকার ঘর, যেখানে বছরের পর বছর ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সাধনা করে আসছেন।

রঙিন ‘কাকালিং’ ও রহস্যময় প্রাচীন পুঁথি

মঠে প্রবেশ করতেই পর্যটকদের নজর কাড়ে একটি অনন্য কুঁড়েঘরের মতো দেখতে প্রবেশদ্বার, যাকে বলা হয় ‘কাকালিং’। এই রঙিন প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দেখা মেলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত পবিত্র এবং প্রাচীন গ্রন্থ ‘কাংগ্যুর’ এবং ‘তেংগ্যুর’-এর সংগ্রহ।

সবচেয়ে তাজ্জব বিষয় হলো, শত শত বছর ধরে এই মঠের নিজস্ব প্রাচীন প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে। সেখানে স্থানীয় উপায়ে তৈরি কাগজ এবং বিশেষ কাঠের ব্লক ব্যবহার করে ভিক্ষুরা হস্তচালিত পদ্ধতিতে নিজেদের ধর্মীয় বই ও শ্লোক ছাপিয়ে থাকেন।

হারিয়ে যাওয়া ঘোড়া ও স্থান নির্বাচন: যে গল্প আজো রোমাঞ্চ ছড়ায়

এই বিশাল মনাস্ট্রি নির্মাণের পেছনে একটি জনপ্রিয় ও অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। ১৭ শতকে যখন মেরাক লামা লোদ্রে গিয়াৎসো মঠ তৈরির উপযুক্ত স্থান খুঁজছিলেন, তখন তিনি কোনো সঠিক জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি একটি নির্জন গুহায় বসে ঈশ্বরের কাছে গভীরভাবে প্রার্থনা করতে শুরু করেন।

গভীর আরাধনা শেষে গুহা থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর সঙ্গে থাকা ঘোড়াটি উধাও হয়ে গেছে! দুশ্চিন্তায় পড়ে তিনি ঘোড়াটির সন্ধানে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তিনি দেখতে পান, পাহাড়ের উঁচুতে ‘তানা মান্দেখাং’ নামক এক পুরোনো ধ্বংসাবশেষের জায়গায় শান্ত মনে ঘাস খাচ্ছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া ঘোড়াটি।

তিব্বতি ভাষায় ‘তা’ (Ta) শব্দের অর্থ ‘ঘোড়া’ এবং ‘ওয়াং’ (Wang) শব্দের অর্থ হলো ‘পছন্দ করা বা নির্বাচন করা’। ঘোড়াটি যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই এককালে প্রাচীন এক রাজপ্রাসাদ ছিল। লামা লোদ্রে এটিকে ঐশ্বরিক নির্দেশ এবং শুভ লক্ষণ বলে মনে করেন। এরপরই স্থানীয় আদিবাসীদের সহায়তায় সেই পাহাড়ের চূড়াতেই গড়ে ওঠে আজকের এই বিখ্যাত ‘তাওয়াং মনাস্ট্রি’।

আজ অরুণাচল প্রদেশে আসা দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটকদের কাছে হিমালয়ের কোলঘেঁষা এই ইতিহাস এবং রোমাঞ্চকর পরিবেশ অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Pratik Saha
  • Pratik Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *