“ওরা কেউ আমার বন্ধু ছিল না!” দল ছেড়ে যাওয়া জ্যোতিরাদিত্য-আজাদকে নিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস রাহুলের?

দিল্লির নির্বাচন কমিশন বিরোধী প্রতিবাদ এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিক্ষোভের উত্তাপের মাঝেই এবার দেশের পুরনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের অন্দরমহলে শুরু হয়েছে তীব্র শোরগোল। তরুণ ও লড়াকু যুব কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে একটি ঘরোয়া চা-চক্রে মিলিত হয়ে অতীতে দল ছেড়ে বিজেপিতে বা অন্য শিবিরে চলে যাওয়া একাধিক হাই-প্রোফাইল প্রভাবশালী নেতাকে নিয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। দলীয় সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বৈঠকে উপস্থিত তরুণ কর্মীদের উজ্জীবিত করতে গিয়ে রাহুল সরাসরি দাবি করেছেন যে, অতীতে লোভ ও ক্ষমতার মোহে বা ভয়ের কারণে যে সমস্ত শীর্ষস্থানীয় নেতারা দলত্যাগ করে চলে গেছেন, তাঁদের চলে যাওয়ায় কংগ্রেসের কোনো ক্ষতি হয়নি। উল্টোটা বুঝিয়ে তিনি দাবি করেন, সুবিধাবাদীরা সরে যাওয়ায় বর্তমানে কংগ্রেসে কেবল খাঁটি ‘সিংহ’ বা আপসহীন লড়াকু নেতারাই অবশিষ্ট রয়ে গেছেন।

বৈঠকের এক আকর্ষনীয় ও নাটকীয় মুহূর্তে রাহুলের এই বক্তব্যের মাঝে অত্যন্ত রসিকতার সুরে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে খাস আড্ডার মেজাজে খোদ রাহুলকে এক হালকা খোঁচা দিয়ে বলেন যে, অতীতে যে সমস্ত নেতারা দল ছেড়ে অন্য শিবিরে ভিড়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নাকি আদতে রাহুলের ব্যক্তিগত ‘বন্ধু’ ছিলেন! খাড়্গের মুখে এমন অপ্রত্যাশিত মন্তব্য শুনে প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে যান রাহুল গান্ধী। তবে সঙ্গে সঙ্গেই সামলে নিয়ে তিনি পাশে বসে থাকা নিজের বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর দিকে ইশারা করে খাড়্গের সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় উত্তর দেন, “আমার বোন এখানেই বসে রয়েছে। ও খুব ভালোভাবেই জানে যে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া কখনওই আমার বন্ধু ছিলেন না।”

এরপরই রাজনীতিতে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের সংজ্ঞা ও শত্রুতা নিয়ে নিজের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক দর্শনের এক গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন রাহুল। তিনি শোনান তাঁর ঠাকুমা তথা দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে জড়িত এক ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিগত গল্প। রাহুল জানান, রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ তিনি মূলত তাঁর ঠাকুমার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। ছোটবেলায় কৌতূহলী মনে তিনি একদিন ইন্দিরা গান্ধীকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বা বেস্ট ফ্রেন্ড কে? জবাবে ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত শান্তভাবে তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। তখন কৌতূহলবশত রাহুল তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করা এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এক মহিলার নাম উল্লেখ করে জানতে চেয়েছিলেন যে তিনি কি তবে তাঁর ভালো বন্ধু নন? এর উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী এক কড়া ও বাস্তবসম্মত শিক্ষা দিয়ে রাহুলকে বলেছিলেন, “না। হতে পারে আমি হয়তো তাঁর ভালো বন্ধু, কিন্তু তিনি আমার ভালো বন্ধু নন।”

ঠাকুমার এই ঐতিহাসিক শিক্ষার উদাহরণ টেনে রাহুল খাড়্গের দিকে তাকিয়ে রসিকতার সুরে মন্তব্য করেন যে, তিনি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সম্পূর্ণভাবে একজন পেশাদার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ফলে বাইরে থেকে যাকে খুব কাছের এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে মনে হতে পারে, তিনি আদতে প্রকৃত বন্ধু নাও হতে পারেন; আবার যাকে সাধারণ শত্রু বলে মনে হয়, তিনি হয়তো দীর্ঘমেয়াদে শত্রু নন। তাই তাঁর প্রকৃত বন্ধুরা কারা, তা বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তির পক্ষে শনাক্ত করা অসম্ভব।

বৈঠকে উপস্থিত তরুণ কর্মীদের বিশেষভাবে উৎসাহ জোগাতে এবং তাঁদের মধ্যে লড়াকু মানসিকতা গড়ে তুলতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের সুদীর্ঘ ও বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনের লড়াইয়ের উদাহরণও টেনে আনেন রাহুল। তিনি বলেন, খাড়্গেজি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রী পদ পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও কখনও দলের আদর্শের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করেননি। যুব কংগ্রেস, এনএসইউআই (NSUI) এবং সেবা দলের প্রায় ষাট জন তরুণ ও লড়াকু কর্মীকে এদিন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় সদর দফতরে চা খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাহুল। সবার পিঠ চাপড়ে আন্দোলন ও রাজপথের সংগ্রামকে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি রাস্তায় নেমে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কড়া বার্তা দেন।

দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের নতুন এবং সৃজনশীল উপায় খুঁজে বের করার জন্য এদিন তরুণ কর্মীদের বিশেষ পরামর্শ দেন রাহুল। পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী সুরে ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে ফের নতুন করে বড় জমায়েত করার প্রস্তাব দেন, যদিও বর্তমান সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকাকে প্রতিবাদের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এদিনের চা-চক্রের বৈঠকে এক লড়াকু কর্মীর পায়ে প্লাস্টার করা দেখে রাহুল অত্যন্ত মজার ছলে মন্তব্য করেন যে ওই আঘাত আসলে তাঁর কাছে কোনো সামরিক পদকের চেয়ে কোনো অংশে কম কিছু নয়। দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী সুরে রাহুল গান্ধী এও দাবি করেন যে, বর্তমান নরেন্দ্র মোদী সরকারের হাতে বড়জোর আর মাত্র আট থেকে দশ মাস সময় বাকি রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *