কেন ভারত ছাড়ার নির্দেশ অভিনেতা ইমরানকে? কী বলছে নতুন ইমিগ্রেশন আইন?

মুম্বইয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার চরম খেসারত দিতে হচ্ছে বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে। আন্দোলনে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমির খানের ভাগ্নে ইমরানকে অবিলম্বে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিল মুম্বই পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে অভিনেতার হাতে এই সংক্রান্ত একটি আইনি নোটিস তুলে দেওয়া হয়।
মার্কিন নাগরিক ইমরান খানের কাছে ভারত সরকারের দেওয়া ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া (OCI) কার্ড রয়েছে। মুম্বই পুলিশ সূত্রের খবর, আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে তাঁকে ভারত ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপের পর একাধিক বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—ঠিক কোন আইনের ভিত্তিতে তাঁকে দেশ ছাড়ার এই চরম নির্দেশ দেওয়া হলো? একজন ওসিআই (OCI) কার্ডধারী ব্যক্তি কি ভারতে কোনো প্রতিবাদ বা বিক্ষোভে অংশ নিতে পারেন না?
কোন আইনে এই কঠোর সিদ্ধান্ত? সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইমিগ্রেশন অর্থাৎ ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫ (Immigration and Foreigners Act, 2025)-এর ৭ ও ২৯ নম্বর ধারার ওপর ভিত্তি করেই ইমরান খানকে এই নোটিস পাঠিয়েছে মুম্বই পুলিশ।
ভারতে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ, দীর্ঘদিন অবস্থান করা কিংবা দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-
৭ নম্বর ধারা: বিদেশি নাগরিকদের ভারতে আসার পর তাঁদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষটিকে স্পষ্ট করে।
-
২৯ নম্বর ধারা: নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতি বা আইনভঙ্গের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার আইনি ক্ষমতা প্রশাসনকে দেয়।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কোনো বিক্ষোভে উপস্থিতি থাকাটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে দেশছাড়া করার কারণ হতে পারে না। ইমরানের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের অভিবাসন বিধিভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে, নোটিসের ভাষা এবং প্রশাসনের দেওয়া যুক্তি আদালত কীভাবে দেখে, তার ওপরই এই নির্দেশের বৈধতা নির্ভর করছে।
ওসিআই (OCI) কার্ডের অধিকার ও আসল সীমাবদ্ধতা ওসিআই (OCI) কার্ড কোনো ব্যক্তিকে ভারতের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব দেয় না। তাঁদের বিদেশি নাগরিক হিসেবেই গণ্য করা হয়। তবে এই কার্ডের মাধ্যমে উপযুক্ত বিদেশি নাগরিকরা ভারতে দীর্ঘমেয়াদি যাতায়াত, বসবাস, শিক্ষা গ্রহণ, সম্পত্তি কেনাবেচা এবং কিছু নির্দিষ্ট পেশাগত সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু এটিকে ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব’ বলা চলে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতীয় সংবিধান সাধারণ নাগরিকদের যে রাজনৈতিক অধিকার দেয়, ওসিআই কার্ডধারীদের সেই অধিকার নেই। উদাহরণস্বরূপ—তারা ভারতে ভোট দিতে পারেন না, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না কিংবা কোনো সাংবিধানিক পদে বসতে পারেন না।
ওসিআই কার্ডধারীরা কি সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামিল হতে পারেন? বিষয়টির আইনি ব্যাখ্যা অত্যন্ত জটিল। ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) এবং ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদে ভারতীয় নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিরস্ত্র সমাবেশের যে মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা কেবল ভারতীয় নাগরিকদের জন্যই প্রযোজ্য। বিদেশি নাগরিকরা এই অধিকার দাবি করতে পারেন না।
তবে কেবল একটি সরকারবিরোধী প্রতিবাদে উপস্থিতি থাকাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ কি না—তা বিতর্কসাপেক্ষ। ওসিআই নিয়মাবলীতে কিছু কাজের জন্য বিশেষ প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইমরানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, তিনি কেবল এক জায়গায় উপস্থিত থাকার জন্য এই শাস্তির মুখে পড়লেন, নাকি অভিবাসন সংক্রান্ত কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেছিলেন?
হাই-ভোল্টেজ মামলার জল গড়াচ্ছে আদালতে সব মিলিয়ে ইমরান খানের এই ঘটনাটি ওসিআই কার্ডধারীদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নিয়ে এক নতুন আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সূত্রের খবর, মুম্বই পুলিশের দেওয়া দেশ ছাড়ার এই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আইনি লড়াইয়ে নামছেন ইমরান খান। খুব শীঘ্রই তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে চলেছেন। ফলে ওসিআই কার্ডের এক্তিয়ার এবং এই আইনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এখন আদালতের রায়ের ওপরই নির্ভর করছে।