ব্যবসা নাকি সরাসরি রাজনীতি? ইলন মাস্কের ক্ষমতার দাপট নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে প্রশ্ন তুলল আজকের ভূ-রাজনীতি!

ভারতে স্টারলিঙ্কের (Starlink) পরিষেবা চালু করা নিয়ে ইলন মাস্কের সাম্প্রতিক মন্তব্য ফের এক পুরনো এবং অত্যন্ত বিতর্কিত প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে— একজন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীর বাণিজ্যিক ভূমিকার ঠিক কোথায় ইতি ঘটে এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর প্রভাবের শুরুটা ঠিক কোথা থেকে?

ভারতের বাজারে স্টারলিঙ্কের প্রবেশ আটকে দেওয়ার জন্য দেশের কিছু নাম না-করা প্রভাবশালী ধনকুবের বা ‘অলিগার্ক’-এর বিরুদ্ধে একচেটিয়া আধিপত্যের অভিযোগ তুলেছেন মাস্ক। যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, স্টারলিঙ্কসহ অন্যান্য স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি বর্তমানে একই ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত মূল্যায়ন এখনও চলছে। কিন্তু এই সাময়িক বা তাৎক্ষণিক বিরোধের গণ্ডি পেরিয়ে বিষয়টি আদতে ইলন মাস্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া বৃহত্তর এক আন্তর্জাতিক প্রবণতার অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বজুড়ে মাস্কের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নয়া নজির:
আমেরিকা থেকে শুরু করে ইউরোপ, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন—প্রতিটি দেশেই মাস্ক আজ তাঁর বিপুল ব্যক্তিগত অনুগামী, ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এর মতো শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্ক, নির্বাচন এবং সরকারি নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপ করছেন। দেশভেদে তাঁর এই নাক গলানোর ধরনও আবার ভিন্ন। কখনও তিনি প্রকাশ্যেই কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট প্রার্থীর হয়ে প্রচার চালান, আবার কখনও নিজের ব্যবসার স্বার্থ সুরক্ষিত করতে দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন।

আমেরিকা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে শত শত মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচার এবং পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’ (DOGE)-এর দায়িত্ব নেওয়া—মাস্কের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আজ আর শুধু অনুদানদাতার পর্যায়ে সীমিত নেই। একই সঙ্গে তিনি যেমন মার্কিন সরকারের অন্যতম বড় ঠিকাদার (স্পেসএক্স ও নাসা), তেমনই আবার সরকারি নীতি নির্ধারণের অন্দরমহলেরও অতি ঘনিষ্ঠ চরিত্র।

ইউক্রেন: ইউক্রেন যুদ্ধে স্টারলিঙ্কের স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্বীকার করেছেন—মাস্কের এক একটি সিদ্ধান্ত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এই ধরনের ক্ষমতা ঐতিহ্যগত কোনো রাজনীতিকের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক ও প্রভাব বিস্তারকারী।

ব্রাজিল ও জার্মানি: ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া হোক কিংবা জার্মানির রাজনীতিতে অতি-দক্ষিণপন্থী শিবিরকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন জোগানো—মাস্ক বারবার প্রমাণ করেছেন যে, তাঁর বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক মতাদর্শকে আলাদা করা আর সম্ভব নয়।

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার উদারনীতিবাদী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে নিজের স্বার্থকে মিলিয়ে দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে বিনিয়োগের বিশাল সুযোগ তৈরি করে নিয়েছেন তিনি।

বাণিজ্যিক স্বার্থ বনাম রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব:
ভারতের বাজারে স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ডের বিশাল সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই (যেখানে ডেলয়েটের অনুমান অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার ১.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে) মাস্কের এই চাপ সৃষ্টি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু দিনের শেষে ভারতের মতো সার্বভৌম রাষ্ট্রে স্পেকট্রাম বরাদ্দ ও নিরাপত্তা ছাড়পত্রের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলি যখন একজন খামখেয়ালী বিলিয়নিয়ারের বাণিজ্যিক অভিযোগের মুখে পড়ে, তখন তা কেবল দুই কর্পোরেটের লড়াই থাকে না, বরং তা এক বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

ভোটারদের সরাসরি প্রভাবিত করার দিন আজ ফুরিয়েছে। মাস্কের মতো ব্যবসায়ীদের হাতে এখন এমন এক ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো রয়েছে, যার ওপর গোটা বিশ্বের সরকার ও সামরিক বাহিনী পর্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বের এই শীর্ষ ধনকুবের কি তবে আধুনিক বিশ্বের অদৃশ্য ‘সুপার পাওয়ার’?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *