রাজ্যে ডেঙ্গির জোড়া ভ্যারিয়েন্টের হানা! শুরু হয়ে গেল ‘হাই রিস্ক পিরিয়ড’, আপনার জেলা তালিকায় নেই তো?

উৎসবের মরশুমের আবহে রাজ্যবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়ে হাজির হলো ডেঙ্গির জোড়া স্ট্রেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে ডেঙ্গির সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় বা ‘হাই রিস্ক পিরিয়ড’ (High-Risk Period)। চলতি মরশুমে আক্রান্তদের নমুনা পরীক্ষা করতেই উঠে এসেছে আরও এক মারাত্মক তথ্য—রাজ্যের একাধিক প্রান্তে একসঙ্গে দাপট দেখাচ্ছে ডেঙ্গির দুটি অতি সংক্রামক সেরোটাইপ, Den-2 এবং Den-3।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই দুটি সেরোটাইপের যুগল আক্রমণই ডেঙ্গিকে বহু ক্ষেত্রে হেমারেজিক ফিভার বা প্রাণঘাতী ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোমের দিকে ঠেলে দেয়, যার ফলে আচমকা প্লেটলেট কমে যাওয়া এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।
কেন এই সময়টা ‘হাই রিস্ক পিরিয়ড’?
বর্ষার বিদায়লগ্ন এবং শরতের শুরুতেই জমে থাকা স্বচ্ছ জলে এডিস ইজিপ্টাই মশার বংশবৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুত হারে ঘটে। পাশাপাশি উৎসবের কারণে মানুষের লাগাতার যাতায়াত এবং জনসমাগম বেড়ে যাওয়ায় ভাইরাস দ্রুত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। স্বাস্থ্য দফতরের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সংক্রমণ চরম মাত্রায় পৌঁছানোর প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
কোন জেলাগুলিতে ডেঙ্গির সবচেয়ে বেশি দাপট?
স্বাস্থ্য দফতর ও পুরপ্রশাসনের নজরদারিতে যে সমস্ত জেলাকে ‘রেড জোন’ বা অতি সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে:
-
কলকাতা ও সংলগ্ন পুর এলাকা: ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, নির্মাণাধীন বহুতল এবং আবর্জনার স্তূপের কারণে মহানগরী ও তার আশপাশের এলাকাগুলিতে সংক্রমণের হার সর্বাধিক।
-
উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা: বিধাননগর, রাজারহাট, বারাসত, দমদম এবং দক্ষিণ শহরতলির একাধিক পকেটে Den-2 ও Den-3-এর সক্রিয় উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
-
হাওড়া ও হুগলি: শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এলাকা এবং নিকাশিনালা সংলগ্ন ঘনবসতিতে ক্রমাগত বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
-
উত্তরবঙ্গের সংবেদনশীল এলাকা: শিলিগুড়ি পুরনিগম এবং জলপাইগুড়ির একাংশে গত কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গি পজিটিভিটি রেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কোন উপসর্গ দেখলে মুহূর্তের মধ্যে সতর্ক হবেন?
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, Den-2 ও Den-3 আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বরের চেয়ে জটিলতা অনেক দ্রুত বাড়ে। নিচের লক্ষণগুলি দেখা দিলে এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে:
-
তীব্র জ্বর এবং চোখ, কোমর ও হাড়ের সংযোগস্থলে অসহ্য যন্ত্রণা।
-
অতিরিক্ত পেটে ব্যথা ও ক্রমাগত বমি হওয়া।
-
মাড়ি, নাক বা ত্বকের নিচে লালচে ছোপ (রক্তপাতের লক্ষণ)।
-
অস্বাভাবিক ক্লান্তি, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট।
স্বাস্থ্য দফতরের জরুরি নির্দেশিকা
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গি রোগীদের জন্য বিশেষ আইসোলেশন বেড, পর্যাপ্ত প্লেটলেট ও ওআরএস (ORS) মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষকে বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, এসির জল বা নারকেলের খোলার মতো পাত্রে এক দিনের জন্যও জল জমতে না দেওয়ার কড়া আবেদন জানিয়েছেন স্বাস্থ্য আধিকারিকরা। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া কোনও ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs) না খাওয়ার এবং শুরুতেই রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।