১০ গুণ বাড়তি দামে প্রকাশ্য লুটপাট! সুপ্রিম কোর্টের চরম তোপের মুখে ক্যানসারের ওষুধের দাম কমছে ৭০%

ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে যাঁদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হতো, সেই সমস্ত কোটি কোটি রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য এল স্বস্তির এক বিরাট খবর। দীর্ঘদিনের জটিল ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনদায়ী ওষুধগুলোর আকাশছোঁয়া দামে অবশেষে লাগাম টানতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সব কিছু ঠিক থাকলে খুব শীঘ্রই নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা এমআরপি (MRP) এক ধাক্কায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

কেন্দ্র সরকারের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, এই একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপে দেশের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা খরচে বছরে বাঁচবে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা।

সুপ্রিম কোর্টের ‘প্রকাশ্য লুট’ মন্তব্য ও কেন্দ্রের কড়া পদক্ষেপ

ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক বা ডিস্ট্রিবিউটরের ক্রয়মূল্য (PTR) এবং সাধারণ রোগীদের হাত পর্যন্ত পৌঁছানো খুচরো বিক্রেতার বিক্রয়মূল্যের (MRP) মধ্যে বিপুল ও অস্বাভাবিক ফারাক নিয়ে সম্প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট।

একটি ক্যানসার সংক্রান্ত জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে একটি চাঞ্চল্যকর উদাহরণের উল্লেখ করে শীর্ষ আদালত। সেখানে দেখা যায়, যে জীবনদায়ী ওষুধটি খুচরো ওষুধ বিক্রেতারা মাত্র ২,৭০০ টাকায় কিনছেন, সেই ওষুধের প্যাকেটের গায়েই অনায়াসে এমআরপি বা সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য লিখে রাখা হচ্ছে ২৭,০০০ টাকা! অর্থাৎ প্রস্তুতকারক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাচ্ছিল প্রায় ১০ গুণ বা ১০০০ শতাংশ অতিরিক্ত মুনাফা। মারণ রোগে আক্রান্ত নিরুপায় রোগীদের ওপর এই ধরনের লাগামহীন দাম চাপানোকে ‘প্রকাশ্য লুটপাট’ বলে মন্তব্য করে শীর্ষ আদালত এবং অবিলম্বে কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে কড়া তোপ দাগে।

নতুন নিয়মে কী পরিবর্তন আনছে কেন্দ্র?

সুপ্রিম কোর্টের সেই কড়া বার্তার পরই ওষুধ মন্ত্রক ও কেন্দ্রীয় সরকার ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফেরাতে উদ্যোগী হয়েছে। কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্ধারিত মূল্য-নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সমস্ত ‘নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার’ ওষুধের ক্ষেত্রে ট্রেড মার্জিন (Trade Margin) সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনো বিক্রেতা বা সরবরাহকারী ওষুধটিতে ৩০%-এর বেশি নিজস্ব মুনাফা বা মার্জিন যোগ করে চড়া দাম হাঁকাতে পারবেন না।

এই নিয়মের আওতায় আসবে—

  • দেশীয় এবং বিদেশি সংস্থার তৈরি সমস্ত ক্যানসারের ওষুধ।

  • আমদানিকৃত ও জেন্যারিক উভয় ধরনের অ্যান্টি-ক্যানসার ড্রাগ।

২০১৯-এর পর দ্বিতীয় বড় পদক্ষেপে বাঁচবে আড়াই হাজার কোটি

এর আগে ২০১৯ সালেও ৪২টি ক্যানসারের ওষুধের ট্রেড মার্জিন নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। যার সুবাদে ৫২৬টি নামী ব্রান্ডের ওষুধের দাম প্রায় ৫০% কমেছিল এবং রোগীদের বছরে আনুমানিক ৯৮৪ কোটি টাকা বেঁচেছিল। এবার সেই গণ্ডি বহু গুণ বাড়িয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে ক্যানসারের ওষুধকে এই আওতায় আনা হচ্ছে।

যেহেতু ক্যানসারের চিকিৎসা কয়েক মাস থেকে শুরু করে বছরের পর বছর ধরে চলে, তাই প্রতি মাসে ওষুধ কিনতে গিয়ে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। কেন্দ্রের এই মেগা সিদ্ধান্তের ফলে ক্যানসার রোগীদের পকেটের ওপর চাপ যেমন কমবে, তেমনই জীবনদায়ী ওষুধের কালাবাজারি ও অতিরিক্ত মুনাফা লোটার প্রবণতায় ইতি টানা সম্ভব হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *