স্বর্গে গিয়েও যেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী থাকেন! জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যিনি দিয়েছিলেন, সেই নানাকে নিয়ে আবেগঘন বার্তা শাহরুখের

রুপোলি পর্দায় নানা পাটেকার মানেই ছিলেন এক অগ্নিগর্ভ, স্পষ্টবাদী ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব। ক্যামেরার সামনে যেমন, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন ঠিক তেমনই—অকৃত্রিম ও নিজস্ব ভঙ্গিতে অনন্য। ভালোবাসা দেখানোর ভাষাটাও ছিল তাঁর আলাদা; মুখে প্রশংসার জোয়ার না ভাসিয়ে ভুল ধরিয়ে দেওয়া কিংবা বকুনির আড়ালেই লুকিয়ে থাকত তাঁর অগাধ স্নেহ। ভারতীয় সিনেমার সেই কালজয়ী অভিনেতার প্রয়াণে এবার গভীরভাবে শোকস্তব্ধ বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। নানার বিদায়লগ্নে আবেগাপ্লুত কিং খান স্মৃতিচারণে তুলে আনলেন তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু অজানা ও হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়।

নানা পাটেকরের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কথা মনে করে শাহরুখ জানান, সে সময় একটু নার্ভাস হয়ে শ্রদ্ধাবশত নিজের চুল নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন তিনি। বিষয়টি চোখ এড়ায়নি নানার। এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে শাহরুখের হাতটি সরিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন—হিরো হওয়ার বাহ্যিক চেষ্টার চেয়ে আগে একজন খাঁটি অভিনেতা হয়ে ওঠাটাই আসল। সেই প্রথম সাক্ষাতের ছোট্ট অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে শাহরুখের জীবনে এক পরম শিক্ষা হয়ে উঠেছিল।

শাহরুখের মতে, নানা কখনও কাউকে তোষামোদ করার জন্য কথা বলতেন না। যা শুনলে ভালো লাগবে, তা নয়—বরং যা শোনা প্রয়োজন, সেটাই সোজাসাপ্টা বলে দিতেন। তাঁর কথাবার্তা হয়তো কখনও রুক্ষ বা আচরণ কঠিন শোনাত, কিন্তু সেই কঠিন আবরণের নিচে লুকিয়ে ছিল এক নিঃস্বার্থ মায়াবী হৃদয়। আর সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল বকুনি আর ধমকের আড়ালে জড়িয়ে ধরা। শাহরুখের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাও ছিল তেমনই—অসংখ্য তর্ক, মতের অমিল আর বকুনির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক গভীর আত্মিক টান।

অভিনয় জগতের এই অভিভাবকের সঙ্গে কাজের বাইরেও শাহরুখের ছিল দারুণ এক খুনসুটির সম্পর্ক। যার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল ক্যারম খেলা! ক্যারম বোর্ডে নানা ছিলেন অত্যন্ত কড়া ও ভয়ংকর প্রতিযোগী। একের পর এক ম্যাচ জিতে শিশুদের মতো নিজের জয় উপভোগ করতেন তিনি। আজ নানার অনুপস্থিতিতে সেই আড্ডা, চায়ের কাপে ঝড় তোলা তর্ক আর ক্যারম ম্যাচের মুহূর্তগুলোই বারে বারে মনে পড়ছে বাদশাহের।

নানা পাটেকরের চলে যাওয়াকে কেবল একজন সহ-অভিনেতার প্রয়াণ হিসেবে দেখছেন না শাহরুখ, এটি তাঁর জীবনের এক ব্যক্তিগত ক্ষতি। জীবনের শেষ অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে শাহরুখ জানান, তারকা হওয়ার মোহে যেন ভেতরের আসল ‘অভিনেতা’ হারিয়ে না যায়—নানার দেওয়া এই অমোঘ পরামর্শ তিনি সারাজীবন বয়ে বেড়াবেন।

সবশেষে প্রিয় অভিভাবক ও বন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শাহরুখের প্রার্থনা—ঈশ্বর যেন তাঁর আত্মাকে শান্তিতে রাখেন। স্বর্গে গিয়েও নানা যেন একইরকম থাকেন—দুর্দান্ত অভিনেতা, জীবনরসিক এবং ক্যারম বোর্ডের সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাম্পিয়ন! ৭৫ বছর বয়সে নানার এই অকালপ্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা শুধু একটি ইন্ডাস্ট্রির নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত তাঁর লক্ষ কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত রেখে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *