“‘ক্রান্তিবীর’ থেকে নটসম্রাট”—ফিরে দেখা নানা পাটেকরের সেরা ৩ সিনেমা ও ২ নাটক

ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। চারপাশে থিকথিক করছে ভিড়। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও লোকটার চোখেমুখে কোনও ভয় নেই। উল্টে গলার শিরা ফুলিয়ে, তাচ্ছিল্যের হাসিতে ছুড়ে দিচ্ছেন সেই বিখ্যাত সংলাপ— ‘আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে?’ পর্দায় তাঁর এই একটা হুঙ্কারই প্রেক্ষাগৃহে পিনড্রপ নীরবতা তৈরি করেছিল। রাগে লাল হওয়া চোখ আর বিদ্রোহী মেজাজে তিনি ছিলেন অনন্য।
কিন্তু বৃহস্পতিবারের সকালটা আর নতুন করে কোনও সংলাপের সুযোগ দিল না। বাস্তবে মৃত্যু এল একেবারে নিঃশব্দে। গোয়ার শান্ত পরিবেশে ভোরের আলো ফোটার আগেই ৭৫ বছর বয়সে জীবনাবসান হলো ‘নটসম্রাট’ নানা পাটেকরের। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর এই প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বিনোদন দুনিয়া। আজ এই বিশেষ প্রতিবেদনে ফিরে দেখা যাক কিংবদন্তি এই অভিনেতার অভিনয় জীবনের সেরা তিন সিনেমা ও দুই ঐতিহাসিক নাটককে।
১. পরিন্দা (১৯৮৯)
নানার ‘তারকা’ হওয়ার শুরুটা হয়েছিল এই ছবি দিয়েই। ১৯৮৯ সালের ৩ নভেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত বিধু বিনোদ চোপড়ার এই ক্রাইম ড্রামায় তিনি অভিনয় করেছিলেন ‘আন্না শেঠ’ চরিত্রে। রাগে লাল চোখ আর ভিতরে লুকিয়ে থাকা চরম হিংস্রতা দিয়েই তিনি রাতারাতি ঘরে ঘরে পরিচিতি পান। কিষেণের ছোট ভাই করণকে খুনের পরে আন্নার মুখে সেই সংলাপ, ‘ধন্দে কিষেণ, ধন্দে মেঁ কোই কিসিকা ভাই নহি হোতা,’ চরিত্রের নির্মমতাকে এক নিমেষে ফুটিয়ে তুলেছিল। ছবিতে জ্যাকি শ্রফ, অনিল কাপুর, মাধুরী দীক্ষিত ও অনুপম খেরের মতো তারকারা ছিলেন। গল্পের কেন্দ্রে ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই ভাই। ১৯৯০ সালে অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে ভারতের অফিশিয়াল এন্ট্রি ছিল এটি।
মজার বিষয় হলো, নানা এই ছবিতে এসেছিলেন একটু ঘুরপথে। পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া দাদারের শিবাজী নাট্য মন্দিরে ‘পুরুষ’ নাটকে নানাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বড় ভাই কিষেণের রোলে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অনিল কাপুর নানার ভাই হয়ে অভিনয় করতে অস্বীকার করায় নানা পান আন্নার ভূমিকা, আর কিষেণের চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যাকি শ্রফ। পরবর্তীতে নানা নিজেই রসিকতা করে অনিলকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। এই দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি পেয়েছিলেন জীবনের প্রথম সেরা সহ-অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার।
২. ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)
নানা পাটেকরের কেরিয়ারের অন্যতম হিট ও দাপুটে চরিত্র এই ছবি। অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ‘প্রতাপ নারায়ণ তিলক’-এর চরিত্রে তাঁর রাগ আর ক্ষোভ আজও দর্শকের গায়ে কাঁটা দেয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভয়ের বদলে তাচ্ছিল্যের হাসিতে বলা তাঁর সেই কালজয়ী সংলাপ— ‘আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে…’ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মেহুল কুমার পরিচালিত ও প্রযোজিত এই ছবিতে প্রতাপের শুরুটা কিন্তু তথাকথিত নায়কের মতো ছিল না। সে ছিল পরিবারের কাছে পরিত্যক্ত, নেশাগ্রস্ত ও জুয়াড়ি এক যুবক। কিন্তু মুম্বইয়ের দাঙ্গার পটভূমিতে এক সাংবাদিকের প্রভাবে সেই নিষ্ক্রিয় যুবকই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে।
১৯৯৪ সালের ১৭ জুন মুক্তি পেয়ে ছবিটি ব্লকবাস্টার হয়। নানার পাশাপাশি এই ছবিতে ডিম্পল কাপাডিয়া, ড্যানি ডেনজ়ংপা ও পরেশ রাওয়াল অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি একটি জাতীয় পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার ও তিনটি স্টার স্ক্রিন পুরস্কার জিতেছিল। এই ছবির জন্যই সেরা অভিনেতা হিসেবে নানা জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পান।
৩. নটসম্রাট (২০১৬)
মহেশ মঞ্জরেকর পরিচালিত এই মারাঠি ছবিতে নানা অভিনয় করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চ-অভিনেতা গণপত রামচন্দ্র বেলওয়ালকর (আপ্পা) চরিত্রে। অহংকার কী ভাবে ধীরে ধীরে অসহায়তায় বদলে যায়, তা তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন সংলাপের পরের নিখুঁত নীরবতায়। সন্তানদের অবহেলায় ঘরছাড়া বৃদ্ধ নটসম্রাটের সেই করুণ আর্তি, ‘কোনি ঘর দেতা কা? ঘর। একা তুফানলা কোণি ঘর দেতা কা?’ (কেউ কি ঘর দেবে? একটা ঝড়কে কি কেউ ঘর দেয়?), দর্শককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জ্ঞানপীঠজয়ী সাহিত্যিক কুসুমাগ্রজের ১৯৭০ সালের বিখ্যাত নাটকের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবিতে স্ত্রী কাভেরীর চরিত্রে মেধা মঞ্জরেকর ও বন্ধু রামভাউয়ের ভূমিকায় বিক্রম গোখলে অভিনয় করেন। নানার জন্মদিনে (১ জানুয়ারি ২০১৬) মুক্তি পাওয়া এই ছবি মহারাষ্ট্রে দারুণ ব্যবসা করে। নানা নিজেই এটিকে তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প এবং সত্যিকারের অভিনেতা হওয়ার পরীক্ষা বলে মনে করতেন। এই অভিনয়ের জন্য তিনি মারাঠি ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান।
৪. পুরুষ (১৯৮০) – নাটক
জয়বন্ত দালভির লেখা এই বিখ্যাত মারাঠি নাটকে ‘গুলাবরাও’ চরিত্রে নানার অভিনয় ছিল এককথায় ক্ল্যাসিক। গল্পে উচ্চবর্ণের আপ্টে পরিবারের মেয়ে অম্বিকা ও হরিজন সমাজকর্মী সিদ্ধার্থের প্রেম, জাতপাত, রাজনীতির শোষণ এবং নারীদের অধিকারের লড়াই ফুটে উঠেছিল। রিমা লাগুর সঙ্গে ১৬০০-র বেশি রজনী এবং মোট প্রায় ১৯০০ বার মঞ্চস্থ হওয়া এই নাটকই নানাকে থিয়েটারের দাপুটে অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। পরে বিজয়া মেহতার নির্দেশনায় নানা ও উষা নাদকার্নির নিজস্ব দল ‘নাট্য মল্হার’-এর ব্যানারে এর হিন্দি সংস্করণ বিদেশেও সফর করে। ১৯৮০ সালে নানা যখন নিতান্ত সাধারণ এক শিল্পী, তখন এই নাটকই তাঁকে মঞ্চাভিনেতা হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। নানা বলতেন, পরবর্তীতে পর্দায় তারকা হয়ে ওঠার পরে তিনি কখনও তাঁর সেই সেলেব্রিটি স্টেটাসকে গুলাবরাও চরিত্রের উপর চাপিয়ে দেবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। ২০২৫ সালে মুম্বইয়ের এনসিপিএ-তে নাটকটি আবার নতুন প্রযোজনায় ফিরেছে।
৫. হামিদাবাঈচি কোঠি – নাটক
অনিল বর্ভের লেখায় ১৯৭৮ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হওয়া বিজয়া মেহতার বিখ্যাত ‘রঙ্গায়ণ’ নাট্যদলের এই প্রযোজনায় অভিনয় করেই নানার মঞ্চজীবনের সূচনা। এক সহ-অভিনেত্রীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, এটি ছিল তাঁর প্রথম পেশাদার নাটক। গল্পের পটভূমি ছিল যুদ্ধোত্তর যুগ, যখন সিনেমার গানের দাপটে কোঠির ঐতিহ্যবাহী গান হারিয়ে যাচ্ছিল এবং বৃদ্ধা গায়িকা হামিদাবাঈ সেই ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই করছিলেন। মূল ভূমিকায় ছিলেন বিজয়া মেহতা নিজে এবং তাঁর মেয়ে শাব্বোর চরিত্রে অভিনয় করেন নীনা কুলকার্নি। সঙ্গে ছিলেন নানা পাটেকর, অশোক শরাফ ও ভারতী আচরেকর। মাত্র ১৭৫টির কাছাকাছি প্রদর্শনী হলেও বিজয়া মেহতার নির্দেশনার কারণে নাটকটি জনস্মৃতিতে কালজয়ী হয়ে আছে। এই মঞ্চের শিক্ষা থেকেই নানা আয়ত্ত করেছিলেন, মুখের কথার চেয়ে চোখ আর নীরবতা দিয়ে কী ভাবে সবচেয়ে গভীর আবেগ প্রকাশ করতে হয়।
ক্যামেরার পিছনে নানা পাটেকর ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ এক মানুষ। কোটি টাকার মালিক হয়েও মুম্বইয়ের আন্ধেরিতে ১-বিএইচকে ফ্ল্যাটে কাটাতেন সাদামাটা জীবন। ২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে খরাপীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে গড়েন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। কাজের প্রতি নিষ্ঠা এমনই ছিল যে, ‘প্রহার’ ছবির জন্য সেনার কঠিন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময়ে দেশের সেবাও করেন। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। সেলুলয়েডের পাতা থেকে নেমে আসা বাস্তবের এই সত্যিকারের নায়ক কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।