‘সত্যি বলছি যেতে মন চাইছে না!’ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় বেলায় কেঁদে ভাসালেন মেসি

স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৮৫ হাজার অশ্রুসিক্ত দর্শক এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে বুটজোড়া তুলে রাখলেন মহাজাগতিক এক ফুটবল জাদুকর—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বেনিনের বিরুদ্ধে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে গোল করে এবং করিয়ে দলকে জয় এনে দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনাকে বিদায় জানালেন তিনি। তবে রেফারির শেষ বাঁশির পর বুয়েনস আইরেসের বুয়েনস আইরেস মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ম্যাচের ফলের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মেসির অশ্রুসিক্ত বিদায়ী ভাষণ, যার প্রতিটি শব্দ ছুঁয়ে গিয়েছে সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়।

‘কোনদিন লড়াই থামাইনি’—আবেগে ভাসলেন অধিনায়ক

ম্যাচ শেষে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে নীল-সাদা জার্সির অধিনায়ক বলেন, “কী বলব সত্যিই বুঝে উঠতে পারছি না। মনের ভেতর এত আবেগ, এত স্মৃতি একসঙ্গে ভিড় করছে। সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে। বিদায়ী চিঠিতে যেমনটা বলেছিলাম, এখন আমার একটাই কাজ—সবার প্রতি মাথা নত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এত দীর্ঘ সময় এই পবিত্র জার্সি গায়ে জড়াতে পারা আমার জীবনের সেরা সম্মান। আমরা দল হিসেবে সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকার সময়ের মধ্য দিয়েও গিয়েছি; কিন্তু কোনওদিন লড়াই থামাইনি। নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া থেকে কোনওদিন এক পা-ও পিছিয়ে আসিনি। আর আজ ভাবতেই বুক ভেঙে যাচ্ছে যে, এই জার্সিতে আমি আর কোনওদিন ফিরব না। সত্যি বলছি, জীবনের বাকি দিনগুলোতেও বারবার এখানে ফিরে আসতে চাইব।”

সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ও মানসিক টানাপোড়েন

জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার কঠিন মুহূর্তটি কীভাবে এল, তা নিয়েও মন খুললেন মেসি। সতীর্থ ও ভক্তদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমার মন চায় আজীবন এখানেই থেকে যেতে। কিন্তু মনের ভেতর থেকে একটা তাগিদ আসছে—বিদায় নেওয়ার এটাই সবচেয়ে সঠিক সময়। শেষ বিশ্বকাপটা আমাদের জন্য অনেক বড় এক পরীক্ষা ছিল। আমরা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, কাছেও পৌঁছে গিয়েছিলাম। অবিশ্বাস্য কিছু ঘটেনি, আমরা আমাদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলাম। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটা শারীরিক ও মানসিক—উভয় দিক থেকেই আমাদের পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছিল; আমরা কোনওমতে টিকে ছিলাম। তবুও আমরা এই জার্সির সম্মানে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়েছি।”

সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমর্থকদের ভালোবাসা

দীর্ঘ দুই দশকের যাত্রায় সঙ্গে থাকা পুরো দল ও সমর্থকদের স্মরণ করে মেসি যোগ করেন, “আমার প্রতিটি সতীর্থকে ধন্যবাদ। ওরাই আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া, কোপা আমেরিকা জয় করা, ফিনালিসিমা জেতা। আমি যেকোনও দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকতাম, কারণ জানতাম আমার পাশে এমন কিছু যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে যারা দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে লড়বে। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর এই মাঠে ফেরার দিনটি ছিল সুন্দর; আজও সেই ভিডিয়ো দেখলে চোখে জল আসে। আর আজ, ঠিক সেই মাঠেই দাঁড়িয়ে সম্ভবত আমার গোটা কেরিয়ারের সবচেয়ে বেদনাময় দিনটি পার করছি, কারণ আজই আমি জাতীয় দলকে এবং আপনাদের বিদায় জানাচ্ছি।”

গ্যালারিতে সাধারণ সমর্থক হয়ে থাকার অঙ্গীকার

ভবিষ্যতের দিনগুলিতে আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে নিজেকে দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “দেশের রং গায়ে জড়িয়ে নামা আমি ভীষণ মিস করব। তবে আজ থেকে আমি থাকব ওই পাশের গ্যালারিতে, আপনাদেরই মাঝে একজন হয়ে। এই তরুণ ছেলেদের পাশে দাঁড়াব। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—আমরা যখন ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন আমরা যেকোনো শক্তির চেয়ে বেশি অপরাজেয়। সামনে কঠিন দিন আসবে, কারণ এই ক’বছরে আমরা যা অর্জন করেছি তা স্বাভাবিক ঘটনা নয়।”

ভাষণের একদম শেষলগ্নে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি কিংবদন্তি। গলার স্বর ভারী হয়ে আসা অবস্থায় অশ্রুসজল চোখে মেসি বলেন, “সত্যি বলতে, জীবনে কোনওদিন এত কথা বলিনি। আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছেড়ে চলে যেতে আমার মন চাইছে না। শুধু শেষবারের মতো বলব—আমি আপনাদের সবাইকে অন্তর থেকে ভালোবাসি। আপনাদের ভীষণ মিস করব। আর ঈশ্বরের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্তাইন। এটাই আমার চিরকালের গর্ব। আপনাদের সবার সঙ্গে আমার স্বপ্নগুলো সত্যি করতে পেরেছি, এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। আপনাদের সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *