“দেখা করতে চেয়েও হল না শেষ সাক্ষাৎ!”-বেলুড় মঠে গিয়েও কেন ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী?

সত্য ও অহিংসার প্রতীক মহাত্মা গান্ধী এবং বেদান্ত ও আধ্যাত্মিকতার মূর্ত প্রতীক স্বামী বিবেকানন্দ—ভারতের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এই দুই ব্যক্তিত্বের অবদান অতুলনীয়। তাঁরা ভিন্ন যুগের মানুষ ছিলেন না, বরং একই সময়কালের দুই শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। অথচ ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস, জীবনের চলার পথে কখনও সামনাসামনি দেখা হয়নি এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের। কেন অধরা থেকে গিয়েছিল সেই মহামিলন?

জন্মের ব্যবধান ও ভিন্ন কর্মক্ষেত্র

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম ১৮৬৩ সালে এবং মহাত্মা গান্ধীর জন্ম ১৮৬৯ সালে—দু’জনের জন্মের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ছ’বছরের। তাঁদের কর্মপদ্ধতি ও ক্ষেত্রও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বিবেকানন্দ বিশ্বের দরবারে ভারতীয় দর্শন ও বেদান্তকে তুলে ধরেছিলেন, আর গান্ধীজি সত্য, অহিংসা ও গণআন্দোলনকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান অস্ত্র বানিয়েছিলেন। কিন্তু দু’জনের চিন্তাধারার মূল ভিত্তি ছিল একটাই—মানবসেবা ও আধ্যাত্মিকতা। বিবেকানন্দ দরিদ্রের মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখতে পেতেন, আর গান্ধীজির কাছে রাজনীতি ছিল নৈতিক উন্নতির মাধ্যম।

বেলুড় মঠে গান্ধীর সেই অসম্পূর্ণ যাত্রা

১৯০১ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে যোগ দিতে কলকাতায় এসেছিলেন গান্ধীজি। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রাম ছাপিয়ে তিনি ভারতে ততটা পরিচিত না হলেও, ১৮৯৩ সালের শিকাগো ভাষণ দিয়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা ও চিন্তাভাবনা কাছ থেকে উপলব্ধি করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন গান্ধীজি।

নিজের আত্মজীবনী ‘মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’-এ গান্ধীজি উল্লেখ করেছেন সেই স্মৃতির কথা। তিনি লিখেছেন, স্বামীজির সঙ্গে দেখা করার জন্য কলকাতার বালি থেকে বেলুড় মঠের উদ্দেশে প্রায় ৩.২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মঠে পৌঁছে চরম হতাশা অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। সেই সময় অসুস্থ থাকার কারণে স্বামী বিবেকানন্দ কারও সঙ্গে দেখা করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। ফলে দেখা না করেই তাঁকে ফিরে আসতে হয়। এর মাত্র কয়েক মাস পরেই, ১৯০২ সালের জুলাই মাসে প্রয়াণ ঘটে স্বামীজির। ফলে আর কখনও মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ মেলেনি।

আদর্শের মেলবন্ধন

যদিও সামনাসামনি দেখা হয়নি, তবুও বিবেকানন্দের ভাবাদর্শে আজীবন অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন গান্ধীজি। ১৯২১ সালে বিবেকানন্দ জয়ন্তীতে বেলুড় মঠে গিয়ে গান্ধীজি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, স্বামীজির রচনাবলী পড়ার পর দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও টান হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছিল। সরাসরি সাক্ষাৎ না হলেও, ভারতের স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার এই দুই কিংবদন্তির পথ ও লক্ষ্য চিরকাল এক বিন্দুতেই মিলে গিয়েছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *