৯০% প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল! শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে গত ২৬ বছর ধরে পাথরে জীবন খোদাই করছেন এই লড়াকু মানুষটি

জীবন তাঁকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল শৈশবের দোরগোড়াতেই। কিন্তু তিনি প্রতিকূলতার কাছে মাথা নত করেননি। দু’টি পা একেবারেই চলে না, শরীরে রয়েছে ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। তবুও হার না মেনে প্রতিদিন ট্রাইসাইকেলে ভর করে শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে নিজের দোকানে পৌঁছে যান তারকনাথ রায় ওরফে বাবলু। আর সেখানেই হাতের আঙুলের জাদুতে পাথর কেটে তৈরি করেন নজরকাড়া নানা শিল্পকর্ম। গত ২৬ বছর ধরে এই পাথর খোদাইয়ের কাজই তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন এবং বহু মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

পাথর শিল্পে হাতেখড়ি ও দীর্ঘ লড়াই

বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাথরই কারও কাছে জীবিকার উপকরণ, আবার কারও কাছে শিল্পের ক্যানভাস। আর সেই পাথরের ভরসা করেই জীবনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বাবলু। জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর নিত্যসঙ্গী। সরকারি নথি অনুযায়ী তিনি ৯০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধী। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরেই তাঁর পাথর শিল্পে হাতেখড়ি হয়েছিল।

উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর কিছুদিন টিউশনি করেও সংসার চালানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আয়ে পরিবারের দায়িত্ব সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত পুরোদমে পাথর শিল্পকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন বাবলু। বর্তমানে স্ত্রী চন্দনা রায় এবং দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁর চার সদস্যের সংসার। পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব তাঁর একাই কাঁধে।

পর্যটকদের আকর্ষণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রতিদিন ট্রাইসাইকেল চালিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে পাহাড়ের কোলে নিজের দোকানে পৌঁছন তিনি। সেখানে নিখুঁত নিপুণতায় পাথর কেটে তৈরি করেন চোখ জুড়ানো নানা শিল্প সামগ্রী। তাঁর হাতের সেই কাজ দেখতে এবং পছন্দের জিনিস কিনতে দূর-দূরত্ব থেকে ছুটে আসেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। বাবলুর এই কঠিন লড়াইয়ে তাঁর স্ত্রী চন্দনা রায়ও সবসময় তাঁর পাশে থেকে সমানভাবে তাল মিলিয়ে চলেছেন।

তবে বর্তমানে বাঁকুড়ায় পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় কিছুটা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। বাইরে থেকে বেশি দাম দিয়ে পাথর কিনে কাজ চালাতে হচ্ছে বাবলুকে। তা সত্ত্বেও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে আগামী দিনে দোকানটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। শারীরিক কিছু সীমাবদ্ধতা যে মানুষের বড় হওয়ার পথে বাধা হতে পারে না, শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে বসে প্রতিদিন সেটাই প্রমাণ করে চলেছেন এই লড়াকু শিল্পী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *