পিতৃপক্ষে এই ভুল করলেই সর্বনাশ! কর্ণের অভিশাপ এড়াতে তর্পণের আসল পৌরাণিক রহস্য জানেন কি?

গত ২৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণিমা তিথির মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে পুণ্য পিতৃপক্ষ। আজ, ২৯ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে তৃতীয়া তিথি। ব্যস্ত রোজনামচার যান্ত্রিক ভিড়েও এই বিশেষ ১৫টি দিন মানুষকে চোখের পলকে নিজের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় মর্ত্যে নেমে আসেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। তাই ভক্তিভরে তাঁদের উদ্দেশে শ্রাদ্ধ, তর্পণ ও দান-ধ্যান করলে পিতৃপুরুষের আত্মা শান্তি পায় এবং জীবনে ফিরে আসে সুখ ও সমৃদ্ধি। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে, ঠিক কেন করা হয় তর্পণ? এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা আসল পৌরাণিক কাহিনিটি কী?

মহাভারতের কর্ণ ও পিতৃপক্ষের ইতিহাস
পিতৃপক্ষের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে মহিমান্বিত দাতা কর্ণের নাম। মহাভারত অনুসারে, জীবদ্দশায় কর্ণ দু’হাত ভরে প্রচুর সোনা-দানা ও ধনসম্পদ দান করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তিনি যখন স্বর্গে প্রবেশ করেন, তখন দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে খাবারের বদলে খাওয়ার জন্য প্রচুর ধনরত্ন ও সোনা উপহার দেন। হতবাক হয়ে কর্ণ এর আসল কারণ জানতে চান।

তখন দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে জানান যে, সারা জীবন তিনি সোনা-রুপো বা ধনসম্পদ দান করলেও, পরলোকগত পিতৃপুরুষের উদ্দেশে কখনই একমুঠো অন্ন বা জলের অঞ্জলি দেননি। উত্তরে কর্ণ জানান, নিজের জন্মবৃত্তান্ত বা পরিচয় না জানার কারণেই তাঁর দ্বারা এই অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়েছিল। এরপর ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিতে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে মাত্র ১৫ দিনের জন্য ফের মর্ত্যে পাঠান। মর্ত্যে ফিরে কর্ণ নিজের পিতৃপুরুষকে অন্ন ও জল অর্পণ করে তাঁদের তৃপ্ত করেন। পুরাণ মতে, সেই ঐতিহাসিক সময় থেকেই সূচনা হয়েছিল এই পবিত্র পিতৃপক্ষের।

তর্পণের অর্থ ও বর্তমান প্রজন্মের করণীয়
‘তর্পণ’ শব্দটির মূল অর্থ হলো তৃপ্ত করা। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে সমস্ত বিদেহী আত্মা মায়ার বশে বা অতৃপ্ত বাসনায় পৃথিবীতে আটকে থাকেন, তাঁদের তিল ও জল অর্পণের মাধ্যমে শান্ত ও তৃপ্ত করাই হলো তর্পণ। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই সময়ের অভাবে পুজো-পাঠ বা নিয়মের খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে পালন করতে পারেন না। তবে শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, পিতৃপক্ষের এই বিশেষ দিনগুলিতে একান্ত নিষ্ঠাভরে শুধুমাত্র জলের অঞ্জলি দিলেও পিতৃপুরুষরা সন্তুষ্ট হন। এর প্রভাবে জীবনে চলা যে কোনো নেতিবাচক শক্তি বা বাধা কেটে যায় এবং অনায়াসেই মোচন হয় জন্মছকের পিতৃদোষ।

মহালয়া ও তর্পণের দিনক্ষণ
পঞ্জিকা মতে, আগামী ১০ অক্টোবর পালিত হবে সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা বহু প্রতীক্ষিত মহালয়া। ওই দিনই পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ঘটে এবং সূচনা হয় শুভ দেবীপক্ষের। আজ ২৯ সেপ্টেম্বর তৃতীয়া তিথির শ্রাদ্ধ চলছে। এরপর ধাপে ধাপে—

৩০ সেপ্টেম্বর: চতুর্থী ও পঞ্চমী তিথি

১ অক্টোবর: ষষ্ঠী তিথি

২ অক্টোবর: সপ্তমী তিথি

৩ অক্টোবর: অষ্টমী তিথি

৪ অক্টোবর: নবমী তিথি

৫ অক্টোবর: দশমী তিথি

পরবর্তী দিনগুলিতে একাদশী থেকে চতুর্দশী পর্যন্ত আচার পালনের পর আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ায় তর্পণের মাধ্যমে এই পবিত্র পক্ষের পূর্ণ সমাপক ঘটবে। তবে যাঁদের পূর্বপুরুষদের ঠিক কোন তিথিতে মৃত্যু হয়েছে সেই নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানা নেই, তাঁরা চোখ বুজে মহালয়ার দিনই এই আচার পালন করতে পারেন। সকালে পবিত্র স্নান সেরে তর্পণ সম্পন্ন করার পর সাধ্যমতো দানধ্যান করারও বিশেষ রীতি রয়েছে। সনাতন বিশ্বাসের ভিত্তি বলে, এই নিয়ম মেনে চললে পূর্বপুরুষদের অশেষ আশীর্বাদ সবসময় জীবনের সঙ্গে থাকে এবং সমস্ত পথঘাট কুসুমাস্তীর্ণ হয়ে ওঠে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *