আরব সাগরে ভেসে এল বিরল সামুদ্রিক রহস্য! ভারত-দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীদের হাতে এল কোন চাঞ্চল্যকর তথ্য?

আরব সাগরের উপকূল থেকে ভেসে আসা এক অত্যন্ত বিরল সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীকে ঘিরে এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচন করলেন ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা। বিরল প্রজাতির ‘ওয়াইড-রিডজড ইন্দো-প্যাসিফিক ফিনলেস পোরপয়েজ’ (Neophocaena Phocaenoides) নিয়ে চালানো এক যৌথ গবেষণায় এই বিরল প্রাণীটির জিনগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক গঠন এবং তাদের ভবিষ্যৎ বাসস্থান সংক্রান্ত একাধিক স্পর্শকাতর ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সামনে এসেছে। ভারতের জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ZSI) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পুকিয়ং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন।

সমুদ্র সৈকতে রহস্যময় প্রাণী ও বৈজ্ঞানিক জয়
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল কেরলের কোঝিকোড় সমুদ্র সৈকতে, যেখানে একটি ফিনলেস পোরপয়েজের মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবে ভেসে আসে। এই খবর পাওয়ার পরপরই ZSI-এর বিজ্ঞানীরা একে একটি বিরল ও অমূল্য বৈজ্ঞানিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। মৃত প্রাণীটির দেহ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে পচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মাটি থেকে কঙ্কালটি তুলে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পরিষ্কার করা হয় এবং প্রতিটি হাড় জোড়া লাগিয়ে আবার পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালের রূপ দেওয়া হয়।

বর্তমানে এই সম্পূর্ণ সংযুক্ত কঙ্কালটি ZSI-এর পশ্চিমঘাট আঞ্চলিক কেন্দ্রে অত্যন্ত সুরক্ষার সঙ্গে সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষকদের বিশ্বাস, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর শারীরবৃত্তীয় গঠন, বিবর্তন এবং শ্রেণিবিন্যাস সংক্রান্ত গবেষণায় এই নমুনাটি আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানের এক সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।

জিনগত গবেষণায় মিলল বড় ধাক্কা!
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘Ecology and Evolution’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় গবেষকরা মূলত মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং ইকোলজিক্যাল নিশ মডেলিং (Ecological Niche Modeling) পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। আরব সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া এই নমুনার সম্পূর্ণ মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোম তৈরি করে যখন বিশ্বজুড়ে প্রাপ্ত অন্যান্য পোরপয়েজের দলগত উপাত্তের সঙ্গে মেটানো হয়, তখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ফিনলেস পোরপয়েজের তুলনায় এর মারাত্মক জিনগত পার্থক্য ধরা পড়ে।

বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই প্রজাতির একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র উপ-জনসংখ্যা (sub-population) বসবাস করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বিশদ জেনেটিক নজরদারি প্রয়োজন।

বিপন্নতার মুখে বিরল সামুদ্রিক জীবন
গবেষণার দ্বিতীয় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো বাসস্থান সংক্রান্ত ঝুঁকি। পরিবেশগত মডেলিংয়ে দেখা গেছে, এই প্রাণীর সম্ভাব্য উপকূলীয় বাসস্থানের পরিধি বিস্তর হলেও তার মাত্র ২৩.৪ শতাংশ এলাকা বর্তমানে সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা (MPAs) কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী এলাকা (IMMAs)-র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর স্পষ্ট অর্থ হলো—অতিরিক্ত উপকূলীয় শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক মাছ ধরার ট্রলারে অনিচ্ছাকৃতভাবে আটকে পড়া (bycatch), দ্রুতগামী জাহাজের সঙ্গে মারাত্মক সংঘর্ষ এবং ভয়াবহ সমুদ্রদূষণের কারণে এই বিরল প্রজাতিটি এখন বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

দুই দেশের যৌথ শক্তির প্রয়োগ
ZSI-এর শীর্ষ বিজ্ঞানী ড. মনোকারণ কমলাকান্নানের নেতৃত্বে এই অসামান্য নমুনাটি উদ্ধার ও নথিভুক্ত হয়। তিনি জানান, কোঝিকোড়ে এই প্রাণীটি ভেসে আসা গবেষকদের সামনে আরব সাগরের বাস্তুতন্ত্রকে বোঝার এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার পুকিয়ং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. শান্তনু কুন্ডু বলেন, “ভারতীয় গবেষকদের ফিল্ড ট্যাক্সোনমির অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের উন্নত জিনোমিক্স ও এনভায়রনমেন্টাল মডেলিং যুক্ত হওয়ায় একটি নতুন বৈজ্ঞানিক দিগন্ত খুলে গিয়েছে।”

ZSI-এর ডিরেক্টর ড. ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পশ্চিমঘাট আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান বিশ্বনাথ ডি হেগড়ে একযোগে জানান, এই বিশাল কঙ্কালটি শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ দর্শনার্থীদের সামুদ্রিক প্রাণীর অঙ্গসংস্থান বিদ্যা শেখানোর পাশাপাশি সমুদ্র সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এখন জোর দিচ্ছেন ভারত মহাসাগরজুড়ে নিয়মিত সামুদ্রিক সমীক্ষা, জেনোমিক ট্র্যাকিং এবং বিশেষ সামুদ্রিক পথ বা ‘করিডর’গুলোকে আইনি সুরক্ষাবলয়ে আনার ওপর। উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর যেভাবে মানুষের শোষণ বাড়ছে, তাতে ফিনলেস পোরপয়েজের মতো বিরল ও কম-অধ্যয়ন করা প্রাণীদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগই এখন শেষ ভরসা।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *