ভারতের মতোই নিজেদের ‘সূর্য’ তৈরি করছে জার্মানিও, মেগা প্রজেক্টে চমকে যাবে বিশ্ব

সৌরশক্তির মতোই এক অফুরন্ত প্রাকৃতিক শক্তির ভাণ্ডার হাতের মুঠোয় পেতে এবার আসরে নামল জার্মানি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শক্তির এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে চাইছে দেশটি। আর সেই লক্ষ্যেই এবার নিজেদের মাটিতে একটি আস্ত ‘কৃত্রিম সূর্য’ বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন জার্মান বিজ্ঞানীরা। নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তির হাত ধরে শক্তির এই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বেসরকারি সংস্থাগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ শুরু করেছে জার্মানি।

বিজ্ঞানীদের মতে, যে প্রক্রিয়ায় সূর্যের অন্দরে শক্তি তৈরি হয়, ঠিক সেই একই ফিউশন প্রক্রিয়া পৃথিবীতে অনুকরণ করার চেষ্টা চলছে। সূর্যের অভ্যন্তরভাগের তীব্র উত্তাপ এবং চাপ হাইড্রোজেন পরমাণুগুলিকে একত্রিত করে বিপুল শক্তি নির্গত করে। ঠিক এই পদ্ধতিতেই হালকা পরমাণুগুলিকে একত্রিত করে শক্তির পাহাড় গড়তে চাইছে জার্মানি। এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা ফিজিক্স এবং জার্মান সংস্থা ‘প্রক্সিমা ফিউশন’। যৌথভাবে তারা ‘স্টেলারেটর’ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ‘আলফা’ নামের একটি বিশেষ যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে, যার পেছনে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো বা ভারতীয় মুদ্রায় ২৬১৯ কোটি টাকারও বেশি।

চ্যালেঞ্জ যখন কোটি কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রা তবে এই কাজ মোটেও সহজ নয়। ফিউশন প্রক্রিয়ায় প্লাজমাকে লক্ষ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উত্তপ্ত করতে হয়। সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হল যন্ত্রের ভেতরে এই বিশাল তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা। এই সমস্যার সমাধানেই ব্যবহার করা হচ্ছে স্টেলারেটর প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে এক অতি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করা হয়, যা উত্তপ্ত প্লাজমাকে যন্ত্রের দেয়াল থেকে নিরাপদ দূরত্বে ধরে রাখে। জার্মানির ওয়েন্ডেলস্টাইন ৭-এক্স যন্ত্রে এই প্রযুক্তি নিয়ে সফল পরীক্ষাও চালানো হয়েছে।

আলফা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ‘স্টেলারিস’ নামের একটি আস্ত ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বাভারিয়ার গুন্ড্রেমিঙ্গেনে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জায়গাকে এই কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। জার্মান সরকারও এই গবেষণায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। তবে প্লাজমার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং উৎপন্ন শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করার মতো বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গিয়েছে।

পিছিয়ে নেই ভারতও শুধু জার্মানিই নয়, এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই ভারতও। শক্তির এই কৃত্রিম উৎস খুঁজতে গুজরাতের ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা রিসার্চ (IPR)-এও পুরোদমে চলছে গবেষণা। সেখানে টোকাম্যাক যন্ত্রে বিশেষ গাইরোট্রন বসিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা, যা অতি গরম প্লাজমাকে অনেক বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতের শক্তি সংকটের মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে এই কৃত্রিম সূর্য তৈরির লড়াই এখন নতুন মোড় নিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *