নির্ভয়ার ছায়া দিল্লিতে! চলন্ত বাসে নাবালিকা নির্যাতন থেকে পার্কের গণধর্ষণ, স্বতঃপ্রণোদিত মামলা সুপ্রিম কোর্টের

দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে ঘটে চলা একের পর এক নৃশংস ধর্ষণের ঘটনায় এবার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল সুপ্রিম কোর্ট। সাম্প্রতিক সময়ে একটি পার্কে সংঘটিত গণধর্ষণ এবং চলন্ত স্লিপার বাসের ভেতর এক নাবালিকাকে যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগের ঘটনাগুলি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (Suo Motu) আমলে নিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। আদালত সাফ জানিয়েছে যে, জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে বারবার এমন জঘন্য যৌন অপরাধের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কড়া জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিচারপতি জে.বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রশ্ন তুলেছে যে, ২০১২ সালের আলোচিত নির্ভয়া মামলার পর থেকে দেশের আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা বা পুলিশ প্রশাসন আদতে কোনো অর্থবহ অগ্রগতি করেছে কি না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সাধারণ মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জনপ্রশাসন কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতারই নির্মম ইঙ্গিত দেয়।

পুনরুজ্জীবিত নির্ভয়ার বেদনাদায়ক স্মৃতি

শীর্ষ আদালত তার আদেশে দিল্লির স্বরূপ নগরে এক কিশোরীকে নৃশংসভাবে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে। যেখানে পুলিশ একটি মাঠ থেকে নির্যাতিতার পচনশীল মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। পাশাপাশি, গ্রেটার নয়ডা থেকে দিল্লি পর্যন্ত প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ ধরে একটি চলন্ত স্লিপার বাসের ভেতরে এক নাবালিকাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হলেও পুলিশ তা আটকানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। আদালতের মতে, এই বর্বরোচিত ঘটনাগুলি আজও দেশবাসীর মনে ২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের সেই বেদনাদায়ক ও শিহরিত করার মতো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বেঞ্চ জানায়, সহিংসতার ভয় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। অপর্যাপ্ত আলো, দুর্বল নজরদারি, পুলিশের টহলের অভাব এবং কাঠামোগত প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে রাস্তা, পার্ক, বাস, মেট্রো স্টেশন, সাবওয়ে কিংবা ফুটব্রিজের মতো জনবহুল ও উন্মুক্ত স্থানগুলিকে কোনোভাবেই অপরাধের উর্বর ক্ষেত্র বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হতে দেওয়া যায় না।

‘শুধু সংহতির বার্তা দিয়ে দায়িত্ব এড়ানো যাবে না’

এ ধরনের ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় যে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকেই নিতে হবে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বেঞ্চ আরও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেছে যে, এই ধরনের মর্মান্তিক অপরাধের পর সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিছক উদ্বেগ ও সংহতির বিবৃতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; কারণ এই গভীর সামাজিক অনাচারের আসল সমাধান সহানুভূতি প্রকাশ করা হতে পারে না।

অপরাধ প্রতিরোধ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সমাজের অসহায় ও দুর্বল মানুষদের সুরক্ষা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব যাঁদের কাঁধে রয়েছে, সেই সমস্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এখন সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটেই সর্বোচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সমগ্র বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য একটি নতুন মামলা নথিভুক্ত করার নির্দেশ জারি করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *