“সেনা হঠাল চিন!” প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টে বিরাট চাঞ্চল্য, মোদি-শি বৈঠকের পরেই বড় আপডেট

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC বরাবর উল্লেখযোগ্যভাবে সেনা মোতায়েন কমিয়েছে চিন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি বার্ষিক রিপোর্টে এই তথ্য সামনে এসেছে। তবে একই সঙ্গে ওই রিপোর্টে সতর্ক করে জানানো হয়েছে যে, উত্তর সীমান্ত এখনও “স্থিতিশীল, কিন্তু সংবেদনশীল” অবস্থায় রয়েছে। ঠিক একদিন আগেই নয়াদিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চাবিকাঠি হিসেবে মত প্রকাশ করেন দুই নেতাই। ঠিক তার পরের দিনই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এই গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন প্রকাশ পেল।

সেনা প্রত্যাহারের নেপথ্য কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি:
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে দেপসাং এবং ডেমচকে ভারত ও চিনের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সেনা প্রত্যাহার বা disengagement চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ফলেই চিনা সেনা মোতায়েনে এই উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটেছে। উত্তর সীমান্তের পাশাপাশি চিনের ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ এলাকাগুলিতেও সেনার সংখ্যা কমেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সীমান্তের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) পুরোপুরি পিছিয়ে গিয়েছে বা তাদের সামরিক প্রস্তুতি গুটিয়ে নিয়েছে।

মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতের উত্তর সীমান্তের বিপরীতে কৌশলগত ও অপারেশনাল গভীর এলাকায় চিনা সেনা এখনও ১০টি কম্বাইন্ড আর্মস ব্রিগেড (Combined Arms Brigade)-সম আকারের বাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে। চিনের ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ এলাকাতেও সমপরিমাণ বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। ফলে LAC-এর অগ্রবর্তী এলাকায় সেনা কমলেও, চিনের হাতে এখনও পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি মজুত রয়েছে, যা প্রয়োজনে দ্রুত সীমান্তের দিকে এগিয়ে আসতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ১০টি ব্রিগেড?
কম্বাইন্ড আর্মস ব্রিগেড এমন এক সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী, যেখানে পদাতিক সৈন্য, সাঁজোয়া বাহিনী, আর্টিলারি এবং অন্যান্য সহায়ক শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে যেকোনো অভিযান চালানো সম্ভব। কৌশলগত গভীর এলাকায় এই বাহিনীগুলির উপস্থিতির অর্থ হলো, চিন এখনও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি পুরোপুরি কমাননি। এর পাশাপাশি, তিব্বত ও শিনজিয়াং অঞ্চলে নতুন রাস্তা, সেতু এবং বিমানঘাঁটির মতো লজিস্টিক পরিকাঠামো তৈরির কাজও সমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছে বেজিং।

মোদির ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক এবং নতুন কূটনৈতিক উষ্ণতা:
নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের রাজনৈতিক সম্পর্কে বর্তমানে সতর্কভাবে বরফ গলতে শুরু করেছে। ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির বৈঠকে মোদি এবং শি জিনপিং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, মতপার্থক্য যেন কোনোমতেই দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে পরিণত না হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান যে, সীমান্ত এলাকায় শান্তি বজায় রাখাই ভারত-চিন সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নতির মূল শর্ত। অন্যদিকে, শি জিনপিং দুই দেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং ‘অংশীদার’ হিসেবে দেখার বার্তা দেন। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাজার প্রবেশাধিকার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে।

তাহলে কি সত্যিই LAC-এ উত্তেজনা কমেছে?
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টের ইঙ্গিত বলছে—হ্যাঁ, তবে তা আংশিক। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সংঘাতের পর সীমান্তে যে নজিরবিহীন সামরিক সমাবেশ ঘটেছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে অনেক বেশি স্থিতিশীল। ২০২৪ সালের disengagement প্রক্রিয়া আকস্মিক সংঘর্ষের আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও, চিনের গভীর অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ অব্যাহত থাকায় সীমান্ত পরিস্থিতিকে পুরোপুরি বিপদমুক্ত বলতে নারাজ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। আর সেই কারণেই সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও ‘স্থিতিশীল, কিন্তু সংবেদনশীল’ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *