আইফেল টাওয়ার থেকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ! প্যারিসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সকে নিয়ে কোন বড় বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী?

ভারত ও ফ্রান্সের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে এক সম্পূর্ণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব অত্যন্ত বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্যারিসে নবনির্মিত স্বামীনারায়ণ মন্দিরের ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর জোরালো আশা, এই বিশাল ও সুদৃশ্য মন্দিরটি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে আগামী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সগৌরবে টিকে থাকবে।

কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও বিশ্বমঞ্চে ভারত-ফ্রান্স দোস্তি
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও ফ্রান্সের সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে। তাঁর বন্ধু তথা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে যৌথ প্রচেষ্টায় উভয় দেশই বর্তমানে একটি বিশেষ বিশ্বব্যাপী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই ভারত ও ফ্রান্স এক নতুন গতি ও প্রবল উদ্দীপনা নিয়ে একসঙ্গে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে চলতি ২০২৬ সালকে দুই দেশ মিলে ‘ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবন বর্ষ’ হিসেবেও উদযাপন করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার সেতুবন্ধন
ফ্রান্সের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন অতীতের নানা ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক যোগসূত্রকে। তিনি বলেন, ইতিহাস আজও সাক্ষী হয়ে রয়েছে যে, ফ্রান্সে ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সেখানকার মানুষের হৃদয়ে এখনও অম্লান হয়ে আছে। ফরাসি পণ্ডিতদের দ্বারা সংস্কৃত ভাষার প্রসার থেকে শুরু করে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের কথা বলতে গিয়ে তিনি ফরাসি সাহিত্যিক রোমাঁ রোলাঁ-র অবদানের কথাও বিশেষভবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এই সমস্ত ঐতিহাসিক সংযোগ দুই সমাজকে একে অপরের আরও অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

এছাড়া পুদুচেরির শ্রী অরবিন্দ আশ্রমে ‘দ্য মাদার’-এর আধ্যাত্মিক যাত্রা কিংবা শ্রীল প্রভুপাদ স্বামীর ফ্রান্স সফর ও ইসকনের (ISKCON) ভূমিকা দুই দেশের আত্মাকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। এমনকি আইফেল টাওয়ারের চত্বরে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের জমজমাট দৃশ্যগুলি ফ্রান্সে ভারতীয় যোগব্যায়ামের বিপুল জনপ্রিয়তারই জ্বলন্ত প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন মোদি।

প্রাচীন কারুশিল্প ও আধুনিক প্রকৌশলের অপূর্ব সমন্বয়
প্যারিসের নতুন স্বামীনারায়ণ মন্দিরটিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, এটি ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ এবং একইসঙ্গে ‘বিল্ট ইন ফ্রান্স’-এর এক দুর্দান্ত মিশ্রণ। এই মন্দিরের বহু পাথর ভারতে নিপুণভাবে খোদাই করা হয়েছে, যা ফ্রান্সের আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার সঙ্গে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে। এই মন্দির থেকে উৎসারিত ভারতীয় সংস্কৃতির মহান মূল্যবোধ সমগ্র ইউরোপের মানুষের উপকারে আসবে বলে তিনি দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে সময় পেলে তিনি নিজে সশরীরে এই মন্দির দর্শন করবেন বলেও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *