চিনি ও পেঁয়াজের পর এবার মহার্ঘ ডিম! পকেটে টান পড়তে চলেছে আমজনতার, কারণটা কী?

চিনি এবং পেঁয়াজের পর এবার সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের হেঁশেলে বড়সড় ধাক্কা দিতে চলেছে ডিমের দাম। গত এক বছরে দেশের বাজারে ডিমের দাম প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শীতকাল মানেই ডিমের চাহিদা তুঙ্গে থাকা, ফলে বছর শেষের দিকে এই মহার্ঘতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় ডিম সমন্বয় কমিটির (NEC) তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি বাজারে পোলট্রির একটি ডিমের দাম বর্তমানে প্রায় ৭ টাকায় পৌঁছেছে। তবে বিভিন্ন খুচরো বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের তা কিনতে হচ্ছে সাড়ে আট টাকা থেকে নয় টাকা পর্যন্ত দামে। কিন্তু হঠাৎ কেন এই পরিস্থিতি? ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ হলো পোলট্রি ফিডের ক্রমবর্ধমান খরচ, যার প্রধান কাঁচামাল হলো ভুট্টা।
ইথানল উৎপাদন ও ভুট্টার সংকট
পেট্রোলের সঙ্গে ইথানলের মিশ্রণ বাড়ানোর সরকারি নীতির কারণে ইথানল উৎপাদনে শস্যের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এক্ষেত্রে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে উঠে এসেছে ভুট্টা। সরকার ইথানল উৎপাদনের জন্য ভুট্টার উৎপাদন বাড়াতে এবং প্ল্যান্টের আশেপাশে এর চাষে উৎসাহ দিচ্ছে। সরকারি তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের ইথানল সরবরাহ বছরে (ESY) আনুমানিক ১২.৫৮ মিলিয়ন টন ভুট্টা ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে ইথানলের জন্য ভুট্টার এই বাড়তি চাহিদা এবং চাষাবাদের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক কৃষিবাজারে।
পোলট্রি শিল্পে সরাসরি টান
পোলট্রি শিল্পের প্রধান খাদ্য হলো ভুট্টা এবং সয়াবিন। ফলে মুরগির খাদ্যের খরচের সঙ্গে পোলট্রির উৎপাদন খরচ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে ইথানল এবং অন্যদিকে পোলট্রি—উভয় দিক থেকেই ভুট্টার চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তার দামেও তীব্র ঝাঁজ দেখা দিয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিমের এই দাম বৃদ্ধির জন্য একশো শতাংশ ইথানল নীতিকে দায়ী করা ভুল হবে; আবহাওয়া পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ এবং অন্যান্য খাদ্য উপকরণের দামও এর নেপথ্যে সমানভাবে সক্রিয়।
বাড়ছে আমদানির নির্ভরতা
অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা মেটাতে গিয়ে বড়সড় বদল এসেছে বাণিজ্যেও। একসময়ে যে ভারত ভুট্টা রফতানি করত, বর্তমানে দেশীয় চাহিদা মেটাতে তাদের আমদানি বাড়াতে হয়েছে। ২০২৪ সালে ভারত প্রায় ৮.৯ লক্ষ টন ভুট্টা আমদানি করেছে, যার বড় অংশ এসেছে মায়ানমার ও ইউক্রেন থেকে। যদিও ২০২৪-২৫ সালে দেশের অভ্যন্তরীণ ভুট্টা উৎপাদন বেড়ে প্রায় ৪৩.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, তবুও ক্রমবর্ধমান শিল্প ও পশুখাদ্যের চাহিদা সামাল দিতে সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ থেকেই যাচ্ছে।
শীতের মরশুমে কি আরও বাড়বে দাম?
সারা বছরই ডিমের চাহিদা ভালো থাকে, তবে শীতকালে এই ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভুট্টার চড়া দাম এবং পোলট্রি ফিডের বাড়তি খরচের কারণে শীতের মরশুমে ডিমের বাজার আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে ইথানল নীতি লাভজনক হলেও, তা যে এখন সাধারণ মানুষের প্রাতঃরাশের পাতে বড়সড় চোট হানতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।