মাত্র ১৮ বছর বয়সে ৪০ কোটির দেনা! কীভাবে খাদের কিনারা থেকে সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন জে রাজমোহন পিল্লাই?

প্রচলিত কোনো ছকে বাঁধা সাফল্য নয়, জে রাজমোহন পিল্লাইয়ের জীবনকাহিনি হলো হার না মানা মানসিকতা, চরম দায়িত্ববোধ এবং সুদীর্ঘ লড়াইয়ের এক অনন্য দলিল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে যখন তিনি প্রথম বর্ষের কমার্সের ছাত্র, ঠিক তখনই অসুস্থতার কারণে পারিবারিক ব্যবসার পুরো দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় তাঁকে। তবে উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো সোনার চামচ পাননি তিনি। বরং তাঁর কপালে জুটেছিল বিপুল দেনা, আইনি জটিলতা এবং এক গভীর সংকট।
বিশাল দেনার পাহাড় ও কঠিন লড়াই
পিল্লাই যখন পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ কোটি টাকা, অথচ মাথার ওপর ঋণের বোঝাপড়া ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকার! পাশাপাশি ১৭৫টি বিচারাধীন আইনি মামলা এবং বেশ কিছু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছিল তাঁকে। ব্যবসার বিস্তার ঘটানো নয়, সেই মুহূর্তে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল কোনোমতে প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং কর্মচারীদের সঠিক সময়ে বেতন দেওয়া।
কোনও পূর্ব ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি পিছু হঠেননি। একদিকে ব্যাংক ও সরকারি দপ্তরের তাগাদা, অন্যদিকে প্রতি মাসে প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকার সুদ—সব মিলিয়ে এক দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। ঝড়ের মুখে একযোগে সব সমস্যার সমাধান না করে তিনি একটি একটি করে জট খুলতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ধীরে ধীরে দেনা শোধ করা এবং পাওনাদারদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।
পারিবারিক ট্র্যাজেডি এবং ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ
জীবনের এই কঠিন লড়াইয়ের মাঝেই ভাই রাজন পিল্লাইয়ের আকস্মিক প্রয়াণ তাঁর দায়িত্ব আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রায় ১০ কোটি ডলারের সমতুল্য অতিরিক্ত দেনার বোঝা। পরবর্তী সময়ে নোট বাতিলের মতো অর্থনৈতিক ধাক্কাও তাঁর যাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। তবে ছোটবেলায় ডিসলেক্সিয়া বা পঠনসংক্রান্ত সমস্যা কাটিয়ে ওঠার যে জেদ তিনি মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলেন, তা তাঁকে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে লড়তে সাহায্য করেছিল। সংকটের দিনে মায়ের সেই শিক্ষা এবং পরিবারের সুনাম রক্ষার তাগিদই তাঁকে চালিকাশক্তি জুগিয়েছিল।
বিটা বিজনেস গ্রুপ গড়ে তোলার নেপথ্যে
বহু বছর ধরে আইনি লড়াই ও আর্থিক সংকটের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে শেষ পর্যন্ত সেই মৃতপ্রায় পারিবারিক ব্যবসাকেই এক বিশাল বহুমুখী বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে রূপান্তর করেন পিল্লাই। বর্তমানে বিটা গ্রুপের হাত ধরে প্যাকেড ফুড, কাজু, আমন্ড, খেজুর, পেস্তা বাদাম থেকে শুরু করে পানীয়, লজিস্টিকস এবং বিনোদন জগতের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সংস্থার উপস্থিতি রয়েছে।
জে রাজমোহন পিল্লাইয়ের এই অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রা প্রমাণ করে যে, সফল হওয়ার জন্য সবসময় বিশাল মূলধন বা অনুকূল পরিবেশের প্রয়োজন হয় না। সঠিক আর্থিক শৃঙ্খলা, একরোখা জেদ এবং কঠিন সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়ানোর মানসিকতাই একজন প্রকৃত উদ্যোক্তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।